নেপালের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বিশেশ্বর প্রসাদ (বিপি) কৈরালার দুই নাতি-নাতনির মধ্যে একজন বলিউডে ঝড় তুললেও অন্যজন হারিয়ে যান রুপালি জগৎ থেকে। মনীষা কৈরালা হয়েছেন বলিউডের নামকরা অভিনেত্রী, অথচ তার ভাই সিদ্ধার্থ কৈরালা সিনেমা জগতে কখনোই সফল হতে পারেননি।
বিপি কৈরালা ছিলেন নেপালের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৯-১৯৬০)। তার ছেলে প্রকাশ কৈরালা ২০০৫ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত নেপালের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ মন্ত্রী ছিলেন। প্রকাশের সন্তান মনীষা কৈরালা ও সিদ্ধার্থ কৈরালা বলিউডে অভিনয় শুরু করেন। যেখানে মনীষা হয়ে ওঠেন তারকা, সিদ্ধার্থ কখনোই আলো ছড়াতে পারেননি।
মনীষা কৈরালা, এক যুগপ্রভাবী অভিনেত্রী
নেপালে জন্ম হলেও ভারতেই তার শিক্ষা ও সফল কর্মজীবন গড়ে উঠে। মনীষা ছিলেন তার সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রী। যিনি তিনটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড, একটি ফিল্মফেয়ার সাউথ, একটি ফিল্মফেয়ার ওটিটি অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০০১ সালে নেপাল সরকার তাকে অর্ডার অব গোরখা দক্ষিণ বাহু সম্মানে ভূষিত করে।

অভিনয়জীবনের সূচনা ও সাফল্য
মনীষা কৈরালা প্রথম অভিনয় করেন নেপালি ছবি ফেরি ভেটাউলা (১৯৮৯)–এ। দুই বছর পর বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন সুভাষ ঘাই পরিচালিত হিন্দি ছবি ‘সওদাগর’ (১৯৯১)–এর মাধ্যমে। কিছুটা ব্যর্থতার পর তিনি ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাণিজ্যিক ছবিতে সাফল্য পান। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো বোম্বে (১৯৯৫), অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬), ইন্ডিয়ান (১৯৯৬), গুপ্ত: দ্য হিডেন ট্রুথ (১৯৯৭), কাঁচ্ছে ধাগে (১৯৯৯), মুধলভন (১৯৯৯), কোম্পানি (২০০২)।
এছাড়া সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় তার ১৯৪২: এ লাভ স্টোরি (১৯৯৪), আকেলে হাম আকেলে তুম (১৯৯৫), খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬), দিল সে.. (১৯৯৮), লজ্জা (২০০১) এর মতো দারুণ সব সিনেমা। ২০০০-এর দশকে মনীষা অভিনয় করেন একাধিক আর্টহাউস ও ব্যতিক্রমী সিনেমায়, যেমন এস্কেপ ফ্রম তালিবান (২০০৩), মালায়ালাম মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা ইলেক্ট্রা (২০১০), অ্যান্থলজি ফিল্ম আই অ্যাম (২০১০)।
ব্যক্তিগত লড়াই ও প্রত্যাবর্তন
২০১২ সালে মনীষার ডিম্বাশয় ক্যানসার ধরা পড়ে, যা ছিল শেষ পর্যায়ে। প্রায় এক বছর দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১৭ সালে ডিয়ার মায়া সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড়পর্দায় ফেরেন। এরপর সঞ্জু (২০১৮) ছবিতে কিংবদন্তী অভিনেত্রী নার্গিসের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পান। একই বছরে নেটফ্লিক্সের ‘লাস্ট স্টোরিজ’ এও দেখা যায় তাকে। সর্বশেষ তিনি অভিনয় করেছেন সঞ্জয় লীলা বানসালি প্রযোজিত পিরিয়ড ড্রামা সিরিজ ‘হীরামাণ্ডি: দ্য ডায়মন্ড বাজার’ (২০২৪)–এ।

অশান্ত মাতৃভূমি নেপাল নিয়েও সোচ্চার মনীষা
নিজ দেশের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিই মেনে নিতে পারেননি মনীষা। ছাত্রযুবাদের উপর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নির্বিচারে গুলির ঘটনায় প্রতিবাদে সরব হন মনীষা। কাঠমান্ডুর রাস্তায় পড়ে থাকা একটি রক্তমাখা জুতার ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘‘এটা নেপালের ইতিহাসে কালো দিন, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, ন্যায়বিচারের দাবিতে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠ থামাতে পাল্টা বুলেট ছোড়া হয়।’’
অন্যদিকে ভাই সিদ্ধার্থ কৈরালার ব্যর্থ অভিনয়যাত্রা
প্রযোজক হিসেবে ২০০৪ সালে ‘পয়সা উসূল’ ছবি দিয়ে সিনেমা যাত্রা করেন সিদ্ধার্থ কৈরালা। এর পরের বছর মার্কিন টিভি ফিল্ম ‘টেররিজম: বায়ো অ্যাটাক’–এর গল্প লিখেছিলেন। একই বছরে ‘ফান- ক্যান বি ডেঞ্জারাস সামটাইমস’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। তার অভিনীত সবচেয়ে পরিচিত ছবি‘আনোয়ার’ (২০০৭)। এটিও বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। তবে ছবির গান মৌলা মেরে মৌলা এবং তোসে নায়না আজও জনপ্রিয়।
পরবর্তীতে দেখ ভাই দেখ এবং দেশদ্রোহী ছবিতে অভিনয় করলেও তা ব্যর্থ হয়। পরে নেপালি সিনেমাতেও চেষ্টা করেন। ২০১৪ সালে নেপালি ছবি ‘মেঘা’ দিয়েও ব্যর্থ হন তিনি। এরপর সিদ্ধার্থ কৈরালা জনসমক্ষে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যান। বর্তমানে তার একটি ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থাকলেও তিনি আর অভিনয়ে ফিরেননি।

বর্তমান নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা
সেপ্টেম্বরের শুরুর সপ্তাহ থেকে নেপাল গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পর তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। এর সূত্র ধরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষোভ তীব্র আকার নেয়।
শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ও কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে। তিনিই প্রথম নারী, যিনি নেপালের সর্বোচ্চ পদে বসলেন। ডিএনএ ইন্ডিয়া







