রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহলের মাঝেই নিঃশব্দে বিস্তার ঘটছে এক ভয়ংকর বাস্তবতার—ভাসমান শিশুদের টার্গেট করে গড়ে ওঠা পতিতাবৃত্তি ও পর্নোগ্রাফি বাণিজ্যের একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক। যারা সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে অরক্ষিত—তাদেরই ফাঁদে ফেলছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র।
স্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট কিংবা ব্যস্ত নগরীর ফুটপাত—এসব জায়গায় থাকা ভাসমান ও পথশিশুরা ক্রমেই সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। প্রলোভন, ভয় দেখানো ও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের নির্যাতন এবং যৌন বাণিজ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
চ্যানেল আই অনলাইনের অনুসন্ধানে দেখা যায়—খাবার, কাজ বা আশ্রয়ের প্রলোভনে শিশুদের ফাঁদে ফেলে নির্যাতন ও পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্ধার হলেও অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমায় ভোগে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছেলে শিশুর ভুক্তভোগিতা আইনে যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ায় তারা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। এই চক্র ভাঙতে শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট নয়; দরকার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগে আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশু সুরক্ষায় কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তারা বলছেন দেশে বিপুল সংখ্যক পথশিশু ও ভাসমান শিশু রয়েছে, যারা বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি চালু থাকলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এই শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্য ফ্রিডম ফান্ড’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ভাসমান শিশুরা গুরুতর শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছে; প্রায় ৩৩% পথশিশু ছেলে যৌন শোষণের শিকার। পার্ক, টার্মিনাল ও সড়কপথসহ জনসমাগম এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে, তবে সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।
মেয়ে শিশুরা প্রতারণা ও পাচারের মাধ্যমে শোষণের চক্রে জড়ায়, আর ছেলে শিশুরা খাদ্য ও আশ্রয়ের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য হয়। শিশু সুরক্ষায় ছেলে পথশিশুরা এখনো উপেক্ষিত, নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়, মানসিক সহায়তা বা পুনর্বাসন ব্যবস্থা।
“খাবারের লোভে গিয়েছিলাম, ফিরলাম দুঃস্বপ্ন নিয়ে”
১২ বছরের নাঈম (ছদ্মনাম)। গ্রামের বাড়ি থেকে হারিয়ে এসে ঠাঁই হয় ঢাকার একটি বাস টার্মিনালে। দিন কাটত কাগজ কুড়িয়ে, রাতে ফুটপাতে ঘুমিয়ে।
একদিন এক ব্যক্তি তাকে ডেকে বলে—“কাজ করবে? খাবার, ঘুমানোর জায়গা সব থাকবে।” অসহায় নাঈম রাজি হয়ে যায়।
প্রথম কয়েকদিন সব ঠিকই ছিল। তারপর হঠাৎ একদিন তাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। তাকে বাধ্য করা হয় অচেনা লোকদের সঙ্গে যেতে।
“আমি না বললে মারত… দরজা বন্ধ করে রাখত,” — কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায় নাঈম।
কয়েক মাস পর একটি অভিযানে তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তার চোখে এখনো আতঙ্ক— “আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।”
ভালো কাজের প্রলোভন
১০ বছরের সাথী (ছদ্মনাম) কমলাপুর এলাকায় ভিক্ষা করত। এক নারী তাকে বাসায় কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। পরে তাকে একটি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তাকে একটি ফ্ল্যাটে আটকে রেখে নিয়মিত ভিডিও ধারণ করা হতো। ওই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। সাথী জানায়—“ওরা বলত, এটা না করলে আমাকে মেরে ফেলবে।”
একটি বিশেষ অভিযানে তাকে উদ্ধার করা হলেও এখনো সে ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
১৪ বছরের রাকিব (ছদ্মনাম) ঢাকার একটি রেললাইনের পাশে থাকত। সমবয়সী এক বন্ধুর মাধ্যমে সে একটি “ভালো কাজ”-এর প্রস্তাব পায়।
কিন্তু সেখানে গিয়ে সে বুঝতে পারে, এটি একটি পর্নোগ্রাফি চক্র। তাকে দিয়ে জোরপূর্বক ভিডিও তৈরি করা হতো।
“ওরা ভিডিও দেখিয়ে বলত—এখন তুই পালাতে পারবি না,” — জানায় রাকিব।
সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায় না
উদ্ধার হওয়া অনেক শিশুই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তারা সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন ছাড়া এই শিশুদের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা কঠিন।
জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউটের চাইল্ড, অ্যাডলসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, যেসব শিশুরা মানসিক আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন তাদের সকলকে মানসিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। এরপর যদি কারও মানসিক সমস্যা থেকে থাকে তখন তাদের সুনিদিষ্ট মানসিক চিকিৎসা দিতে হবে। সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে আঘাতের ধরন, সময়কাল এবং শিশুর আচরণগত পরিবর্তনের ওপর। মানসিক আঘাত প্রাপ্ত শিশুর সুস্থতায় পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ছেলেশিশুর নেই যথাযথ আইনি স্বীকৃতি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন নিয়ে আলোচনায় একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায় কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা গুরুত্ব পেলেও পথশিশু ও ছেলে শিশুদের ওপর নির্যাতন প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।
আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা নারীভিত্তিক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ছেলে শিশুদের ভুক্তভোগিতা আইনি স্বীকৃতি পায় না। পাশাপাশি সমাজে এমন এক শ্রেণীবিন্যাস কাজ করে, যেখানে কিছু ভুক্তভোগিতা গুরুত্ব পায়, অন্যগুলো উপেক্ষিত থাকে—পথশিশুদের ক্ষেত্রে যা আরও গভীর।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইনি প্রক্রিয়া ধীর ও অনিশ্চিত হলে যৌন সহিংসতা শুধু ঘটে না, বরং বারবার পুনরাবৃত্তি হয়। এই চক্র ভাঙতে হলে কেবল আইন কঠোর করা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন সমন্বিত আচরণগত পরিবর্তন।
মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের রাস্তা থেকে সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখা এবং ধীরে ধীরে তাদের সমাজে আবার স্বাভাবিকভাবে ফিরিয়ে আনা।দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে শহরে একীভূত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা, পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা, যাতে তাদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
ভাসমান ও পথশিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা একটি জনগোষ্ঠী। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অদৃশ্য শোষণচক্র আরও বিস্তার লাভ করবে।
দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে থাকছে ‘শিশু যৌন শোষণে আন্তর্জাতিক চক্র’







