এক কিশোরীর ‘হুঙ্কার’, টলে গেল ধর্মীয় গুরুর সাম্রাজ্য!
আলোচিত যে সিরিজটি অবশ্যই দেখা উচিত

ধর্মীয় গুরু কর্তৃক যৌন নির্যাতন- ভারতীয় সিনেমা ও ওয়েব সিরিজে বিষয়টি নতুন নয়। ‘আশ্রম’, ‘মহারাজ’ কিংবা ‘সির্ফ এক বান্দা কাফি হ্যায়’-এর মতো নির্মাণে বারবার উঠে এসেছে ক্ষমতাবান ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্ধবিশ্বাস এবং তাদের প্রভাবের গল্প। সেই একই ধারার আরেকটি সিরিজ ‘হুঙ্কার: দ্য রোর’। তবে ছয় পর্বের এই জিওহটস্টার সিরিজকে আলাদা করে দেয় এর গল্প বলার ধরন।
এখানে গল্পের কেন্দ্র শুধু অভিযুক্ত ধর্মীয় গুরু নন, বরং সেই কিশোরী- যে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করে। আর সেই জায়গাতেই সিরিজটি হয়ে ওঠে আরও তীব্র, অস্বস্তিকর এবং প্রাসঙ্গিক।
নিত্য মেহরা ও করণ দারিয়াস কাপাডিয়া নির্মিত ‘হুঙ্কার: দ্য রোর’-এর গল্প ১৭ বছর বয়সী মীনু রাওয়াতকে ঘিরে। মীনুর অভিযোগ, প্রভাবশালী ধর্মীয় গুরু সুনীল ‘বাপজি’ চাকোসি তাকে যৌন নির্যাতন করেছেন। অভিযোগ জানানোর পর মীনু ও তার পরিবারকে শুধু আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখিই হতে হয় না; বরং তাদের মোকাবিলা করতে হয় পুলিশ, সংবাদমাধ্যম, সমাজ এবং বাপজির হাজার হাজার অনুসারীর রক্তচক্ষুও!
সিরিজটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো- এটি খুব সহজে ‘ভালো বনাম খারাপ’-এর গল্পে আটকে যায়নি। বরং দেখিয়েছে, একজন নির্যাতনের শিকার মানুষ যখন ক্ষমতাবান কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তখন তার নিজের জীবন কীভাবে সবার আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
শুরুর একটি দৃশ্যেই সিরিজটির মূল সুর স্পষ্ট হয়ে যায়। বাবা-মায়ের সঙ্গে থানায় অভিযোগ জানাতে যায় মীনু। সেখানে এক ধর্মভক্ত পুলিশ কর্মকর্তা প্রসাদ বিলি করছিলেন। মীনুর হাতে তিনি একটি লাড্ডু তুলে দেন। অন্যদের কাছে সেটি আশীর্বাদ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক হলেও মীনুর কাছে সেটিই হয়ে ওঠে ভয়াবহ এক স্মৃতি—কারণ যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেই বিশ্বাসের সঙ্গেই এখন তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এ ধরনের ছোট ছোট মুহূর্তেই ‘হুঙ্কার’ দেখিয়েছে, মীনু যে ব্যবস্থার কাছে নিরাপত্তা চাইছে, সেই ব্যবস্থারই কোথাও না কোথাও বাপজির প্রভাব ও বিশ্বাসের শিকড় ছড়িয়ে আছে।
সিরিজটির প্রাণ অনীত পাড্ডা। ‘সাইয়ারা’র মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার আগেই ‘হুঙ্কার’-এর শুটিং করেছিলেন তিনি। মীনু চরিত্রে তার অভিনয় দেখায়, কেন এই অভিনেত্রীকে নিয়ে এত আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ভয়, রাগ, বিভ্রান্তি, ক্লান্তি- মীনুর প্রতিটি অনুভূতি খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অনীত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মীনুকে তিনি নিখুঁত কোনো চরিত্র হিসেবে দেখাননি। তারও ভুল আছে, দুর্বলতা আছে, নিজের মতো করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা আছে।
মীনু অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মদ খেয়েছে, জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করেছে, একজন পুরুষ শিক্ষকের প্রতি তার আবেগ তৈরি হয়েছে—এসব ব্যক্তিগত বিষয়ই পরে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এমনকি নির্যাতনের পর তার আচরণও খুঁটিয়ে দেখা হয়, যেন একজন ‘সত্যিকারের ভুক্তভোগী’কে কেমন হতে হবে, তারও একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
কখনো সে বাইরে গিয়ে স্ট্রিট ফুড খেলে প্রশ্ন ওঠে, সে যদি সত্যিই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, তাহলে বাইরে যাচ্ছে কেন। আবার বেশি কাঁদলে বলা হয় নাটক করছে, না কাঁদলে বলা হয় সে মিথ্যা বলছে। অর্থাৎ নির্যাতনের শিকার একজন মানুষের কাছ থেকেও সমাজ নিজের তৈরি আচরণবিধি মেনে চলার প্রত্যাশা করে। এই জায়গাটিই ‘হুঙ্কার’-এর অন্যতম শক্তি।
রঘুবীর যাদব ‘বাপজি’ চরিত্রে অসাধারণ। তাকে এই চরিত্রে বেছে নেওয়াটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দর্শক তাকে উষ্ণ, মজার কিংবা নিরীহ ধরনের চরিত্রে দেখে অভ্যস্ত। সেই পরিচিত মুখকেই এখানে এমন একজন ধর্মীয় নেতার ভূমিকায় দেখা যায়, যার ব্যক্তিত্বের আড়ালে রয়েছে ভয়ংকর ক্ষমতার কাঠামো।
বাপজি গতানুগতিক কোনো খলনায়ক নন। তিনি জানেন কীভাবে মানুষের দুর্বলতা, আশা ও বিশ্বাসকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে হয়। তার অনুসারীরা তার কথায় প্রজ্ঞা খুঁজে পায়, তার কর্মকাণ্ডে ঈশ্বরের ইশারা দেখে। অভিযোগ ওঠার পরও তারা তাকে ছেড়ে যায় না। গ্রেপ্তারের পরও তার প্রতি তাদের বিশ্বাস অটুট থাকে।
এভাবেই সিরিজটি একজন প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় গুরুর চারপাশে তৈরি হওয়া অন্ধবিশ্বাস, ক্ষমতা ও প্রভাবের ভীতকে দারুণভাবে পর্দায় তুলে ধরেছে। মীনুর অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়- তার সামনে দাঁড়িয়ে যায় একটি বিশাল বিশ্বাসের কাঠামো।
ফাতিমা সানা শেখ অভিনয় করেছেন এসিপি জসলিন সিং সইনের চরিত্রে। তিনি কোনো ‘সুপারকপ’ নন। তদন্ত করতে গিয়ে ভুল করেন, ব্যক্তিগত ও পেশাগত চাপ সামলান, তবু মীনুর অভিযোগের সত্যতা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যান। চরিত্রটিকে সংযত অভিনয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন ফাতিমা।
মোহাম্মদ জিশান আইয়ুবের চরিত্র আইনজীবী বালেরাও। মীনুর কথা বিশ্বাস করে তিনি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, যেখানে তার মক্কেলের বিপরীতে রয়েছে বিপুল সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব।
অর্জুন মাথুর অভিনয় করেছেন সাংবাদিক অমিতাভ সিনহার চরিত্রে। চরিত্রটি কিছুটা পরিচিত ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকের হলেও মাথুরের অভিনয়ে তার অহংকার, হতাশা ও পেশাগত দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
মীনুর বাবার চরিত্রে রাজেশ শর্মাও নজর কাড়েন। কারণ তিনিই একসময় বাপজির ভক্ত ছিলেন, অথচ এখন তার নিজের মেয়ের অভিযোগ সেই বিশ্বাসের ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দেয়। এই দ্বন্দ্বটি রাজেশ শর্মা অতিনাটকীয় না করে ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘হুঙ্কার’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে আদালতের ভেতরের বিচারের পাশাপাশি আদালতের বাইরের বিচারও দেখানো হয়েছে।
টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিজেদের মতো করে গল্প তৈরি করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীনুকে আক্রমণ করা হয়, তদন্তের পক্ষে থাকা মানুষদের হুমকি দেওয়া হয়, আর পরিবারকে বারবার নিরাপদ জায়গা বদলাতে হয়।
মীনুর জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাকে একের পর এক সেফ হাউসে রাখা হয়। পুলিশের পাহারায় থেকেও তার নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মুখ ঢেকে চলতে হয়, স্বাধীনভাবে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে বাপজির অনুসারীরা আগের মতোই তাকে পূজা করে যায়।
এই বৈপরীত্যই সিরিজটিতে সমাজের সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলে। একজন অভিযোগকারী নিরাপত্তার নামে বন্দি হয়ে যায়, আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে নিজের প্রভাবের কারণে আগের মতোই ক্ষমতাবান থাকে।
তবে সিরিজটি পুরোপুরি নিখুঁত নয়, তারপরও শেষ পর্যন্ত ‘হুঙ্কার: দ্য রোর’ যে জায়গায় এসে দাঁড়ায়, সেটিই সিরিজটির সবচেয়ে বড় শক্তি। পুরো গল্পজুড়ে যে মেয়েটির কণ্ঠকে চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, শেষ পর্যন্ত সেই মেয়েই নিজের কথা বলার জায়গা তৈরি করে নেয়। একজন প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় গুরুর চারপাশে তৈরি হওয়া বিশ্বাস ও ক্ষমতার ভীতকে নাড়িয়ে দেওয়ার গল্প হিসেবে ‘হুঙ্কার: দ্য রোর’ তাই শুধু আরেকটি ক্রাইম ড্রামা হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এমন এক কিশোরীর গল্প, যে নিজের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার জন্য একটি বিশাল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া






