মতামত

ছোটকাকু: একটি অনুভূতির নাম

ছোটকাকু: একটি অনুভূতির নাম

ছোটকাকু একটি অনুভূতির নাম। এক ধরনের চেতনা। যাদের ছোটকাকু আছে, তাদের কাছে এই শব্দের অর্থ একরকম। আর যারা নিজেরাই ছোটকাকু, তাদের কাছে অর্থটি ব্যাপকতর।

আমি নিজেও একজন ছোটকাকু। তাই আমাকে যারা ছোটকাকু ডাকে, সেই ডাকের ভেতরের ভালোবাসাটা আমি বুঝি। ছোটকাকু ডাকা মানুষগুলোর চোখের মায়া যেমন বুঝি, তেমনি বুঝি ছোটকাকু হয়ে ওঠার নিঃশব্দ আনন্দটাও। আবার ছোটকাকু হয়ে থাকার যে এক ধরনের অদৃশ্য দায়িত্ব আছে, বুঝি সেটাও।

‘ছোটকাকু’ ডাকটি শুনলেই শৈশবের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আশির দশকের সেই সময়। আমাদের শৈশব ছিল বইয়ের সঙ্গে, মাঠের সঙ্গে, পাঠাগারের সঙ্গে এবং সংগঠনের সঙ্গে। বিকেল মানেই মাঠ। অবসরের একটি বড় অংশ মানেই বই। নিয়মিত লাইব্রেরিতে যাওয়া ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর, চাঁদের হাট, মুকুল ফৌজ; এ ধরনের শিশুকিশোর সংগঠনগুলো আমাদের শুধু সময় কাটানোর জায়গা ছিল না; এগুলো ছিল মানুষ হয়ে ওঠার পাঠশালা।

সংগঠনগুলো শিশুকিশোরদের শুধু বিনোদন দিত না; তাদের দলবদ্ধ হতে, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে, দায়িত্ব নিতে এবং সমাজকে দেখতে শেখাত। আমাদের সময় মাঠ ছিল, খেলাধুলা ছিল, বই ছিল, সংগঠন ছিল; শৈশবের জন্য ছিল একটি সামাজিক পরিসর।

আমরা তখন জানতাম না, এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো একদিন আমাদের জীবনবোধ তৈরি করবে। একটি বই পড়া যে কল্পনাশক্তি বাড়ায়, একটি নাটকে অংশ নেওয়া যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, একটি সংগঠনে কাজ করা যে নেতৃত্ব শেখায়, আর মাঠে খেলতে নামা যে দলবদ্ধতা শেখায়; এসব তখন আলাদা করে বুঝিনি। বড় হয়ে বুঝেছি।

সেই শৈশবের ধারাবাহিকতায় বাংলা শিশুসাহিত্যে ‘ছোটকাকু’ আমার কাছে তাই বিশেষ একটি চরিত্র। শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগরের জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ ‘ছোটকাকু’র পেছনেও রয়েছে ব্যক্তিগত স্মৃতির ছায়া। তাঁর নিজের ছোটকাকু ছিলেন ড. ফজলুল আলম। ছড়াকার আমীরুল ইসলামও চরিত্রটির অনুপ্রেরণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকেই যেন জন্ম নেয় বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের কাছে পরিচিত এক নিজস্ব গোয়েন্দা চরিত্র: ‘ছোটকাকু’।

ফেলুদা, কাকাবাবু, টেনিদা, শবর কিংবা ব্যোমকেশ বকশীর পাশে তাই ছোটকাকুরও একটি স্বতন্ত্র বাঙালি পরিচয় তৈরি হয়েছে।

২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই সিরিজ এখন বাংলাদেশের শিশুকিশোর সাহিত্যে নিজস্ব একটি জায়গা তৈরি করেছে। ৪৮টি রহস্যকাহিনীর দীর্ঘ যাত্রায় গল্পের পটভূমি হয়েছে বাংলাদেশের ৪৫টি জেলা। আর বইগুলোকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত টিভি সিরিজে নির্মিত হয়েছে প্রায় দুইশ পর্ব। এক সব্যসাচী মানুষ আফজাল হোসেনের নির্মাণে পর্দায় ছোটকাকু হয়েছেন আফজাল হোসেন নিজে। পর্দা আর কাগজের বইয়ে ছোটকাকুর রহস্যের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ভূগোল, মানুষ ও বৈচিত্র্যও শিশুদের কাছে পৌঁছেছে।

চলতি সপ্তাহে অন্যপ্রকাশ নতুন মোড়কে সিরিজের ১৪টি বই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ১০টি বইয়ে রয়েছে দুটি করে মূল রহস্যকাহিনি এবং চারটি বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ।

কিন্তু ছোটকাকুকে নিয়ে কথা বলার সময় শুধু বইয়ের হিসাব করলে হয় না। কারণ ছোটকাকু আসলে আমাদের একটি হারিয়ে যেতে বসা শৈশবের কথাও মনে করিয়ে দেয়।

ফেলুদা, কাকাবাবু, টেনিদা, শবর কিংবা ব্যোমকেশের মতো ছোটকাকুও আমাদের সাহিত্যের নিজস্ব এক বাঙালি গোয়েন্দা চরিত্র। তবে ছোটকাকুর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার রহস্য সমাধানের মধ্যে নয়; তার শক্তি শিশুদের কৌতূহলী করে তোলার ক্ষমতায়।

আজ আমাদের শিশুদের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। পড়ার অভ্যাস কমছে। খেলার মাঠ কমছে। পাড়া-মহল্লার সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের সংগঠিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও আগের মতো দৃশ্যমান নয়। একই সময়ে আমরা ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছি।

কিন্তু শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে তো সমাধান হবে না। শিশুদের বিকল্প জগৎ তৈরি করতে হবে। তাদের হাতে বই দিতে হবে, মাঠে নিতে হবে, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, দলবদ্ধভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ‘ছোটকাকু’।

ছোটকাকু ক্লাব হতে পারে পাঠচক্রের জায়গা। ছোটকাকু উৎসব হতে পারে বই, নাটক, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির মিলনমেলা। ছোটকাকুর গল্প হতে পারে বাংলাদেশের নানা প্রান্তের মানুষ, প্রকৃতি ও ইতিহাসকে জানার দরজা। অর্থাৎ ছোটকাকুকে শুধু একটি বই বা সিরিয়ালের চরিত্র হিসেবে না দেখে একটি শিশুকিশোর আন্দোলনের সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভাবা যায়।

২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ছোটকাকু উৎসব তাই আমার কাছে নিছক একটি সাহিত্য বা সংস্কৃতির উৎসব নয়। এটি যেন আমাদের হারিয়ে যেতে বসা শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি উপলক্ষ।

উৎসব শেষ হয়ে যাবে দুই দিনে। কিন্তু ছোটকাকুর আসল সাফল্য হবে তখনই, যখন উৎসবের আলো ছড়িয়ে যাবে সারা বছর; স্কুলে, লাইব্রেরিতে, মাঠে, পাড়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

একটি শিশুকে একটি বই দেওয়া মানে শুধু তাকে একটি গল্প দেওয়া নয়; তার হাতে তুলে দেওয়া কল্পনার দরজা। আর একটি ছোটকাকু তৈরি করা মানে শুধু একজন গোয়েন্দা তৈরি করা নয়; তৈরি করা কৌতূহলী, অনুসন্ধিৎসু, সাহসী ও সংস্কৃতিমনস্ক একজন মানুষ।

ছোটকাকু শুধু একটি চরিত্র নয়। ছোটকাকু আমাদের শৈশবের স্মৃতি, বর্তমানের প্রয়োজন এবং আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সেতুর নাম।

আমি নিজে একজন ছোটকাকু। এই পরিচয়ের মধ্যে তাই আমার নিজের শৈশবও আছে, আমার প্রজন্মের স্মৃতিও আছে। আর আছে পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি এক ধরনের দায়।

একটি শিশুকে যদি একটি বইয়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি, একটি মাঠে নিয়ে যেতে পারি, একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি; তাহলে হয়তো আমরা তার সামনে অন্যরকম একটি ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারি।

ছোটকাকু শেষ পর্যন্ত তাই শুধু ফরিদুর রেজা সাগরের সৃষ্টি কোনো গোয়েন্দা চরিত্র নয়। আমার কাছে ছোটকাকু একটি সেতু। আমাদের শৈশব আর আগামী প্রজন্মের শৈশবের মধ্যে সেতুবন্ধন।

সেই সেতুটি যেন ভেঙে না যায়।

বিষয়:আফজাল হোসেনআমীরুল ইসলামকাকাবাবুছোটকাকুটেনিদাফরিদুর রেজা সাগর
প্রতিবেদক

জাহিদ নেওয়াজ খান

এডিটর, চ্যানেল আই অনলাইন; চিফ এক্সিকিউটিভ এডিটর, চ্যানেল আই। জন্ম এবং বেড়ে উঠা ময়মনসিংহ শহরে। দি এডওয়ার্ড ইন্সটিটিউশন থেকে এসএসসি এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স করেছেন। উন্নয়ন সাংবাদিকতায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমা করেছেন নয়া দিল্লির ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব মাস কমিউনিকেশন থেকে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মারো ফেলো। বার্লিনের আইআইজে থেকে অনলাইন জার্নালিজমের উপর কোর্স করেছেন। সাংবাদিকতার হাতেখড়ি মিনার মাহমুদের বিখ্যাত 'বিচিন্তা’ দিয়ে। এরপর আরেক আলোচিত সাপ্তাহিক ‘প্রিয় প্রজন্ম’। কাজ করেছেন দৈনিক জনতা, বাংলাবাজার পত্রিকা, দি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বার্তা সংস্থা ইউএনবি, বিডিনিউজ এবং রেডিও টুডেতে। বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বিডিনিউজের তিন প্রতিষ্ঠাতার অন্যতম। ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে আছেন চ্যানেল আইয়ে। সাংবাদিকতার উপর তার একাধিক প্রকাশনা আছে। বিভিন্ন সময় নবীন সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। অতিথি শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশের সঙ্গে। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আছে, 'মোবাইল যুগে সাংবাদিকতা', 'বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’, ‘গণজাগরণে উন্মোচিত মুখোশ‘, 'মূর্তিকারিগর' এবং 'সেলফিকাণ্ড'। বন্ধুদের কাছে তিনি জুয়েল নামে বেশি পরিচিত।

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…