গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের ৩ মাস হতে চলল। এরমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সফলতা অর্জন করেছে। শতভাগ প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও একেবারেই যে পারেনি তা নয়। পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়া অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণ করে এখন পর্যন্ত অনেকে ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এখন পর্যন্ত একটি ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা গিয়েছে। সেটি হলো- বাজারদর নিয়ন্ত্রণ। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েকদিন বাজারদর কিছুটা স্বস্তিদায়ক থাকলেও সেই ধারাবাহিকতা আর রক্ষা হয়নি। উল্টো দেখা গিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে পুরনো সিন্ডিকেট বাজারদর অস্থির করে তুলেছে। সেই পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বাজারের প্রকৃত অবস্থা
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজার অস্থির করার দায়িত্ব যেন নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে সেই পুরনো সিন্ডিকেট। এর প্রভাবে বাজারদরের আগুন থামছেই না। দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাও সেকথা স্বীকার করেছেন। তবে যেভাবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে কথা বলা প্রয়োজন, তিনি কেন যেন সেভাবে কথা বলছেন না! এর ফলে সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলেই শঙ্কা। অবশ্য পরিস্থিতি যখন বেগতিক তখন সরকারের অন্য একাধিক উপদেষ্টা কঠোরভাবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এতে বাজারে নিত্যপণ্যসহ শাকসবজির দাম কিছুটা কমেছে, যদিও এখনও সেটা পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বাজারে এখন ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ২৯০-৩১০ টাকা কেজি দরে। গরুর মাংসের দর অনেকটা স্থিতিশীল; বিক্রি হচ্ছে কোথাও ৬২০ টাকা, কোথাও ৭৫০ টাকা কেজি দরে। রাজধানীর বাজারে সবজির দাম কিছুটা কমেছে। এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি সবজির দর কেজিতে কমেছে ২০ থেকে ৪০ টাকা। ২৪ অক্টোবর প্রতি কেজি কাঁকরোল ৭০-৮০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০, মুলা ও পটোল ৫০-৬০, ঢ্যাঁড়শ ৬০-৭০, বরবটি ৮০-৯০, গোল বেগুন ১২০-১৪০, লম্বা বেগুন ৮০-৯০, টমেটো ১৬০-১৭০, করলা (উচ্ছে) ৮০-৯০, কচুরমুখি ৫০-৬০ এবং ধুন্দল ও ঝিঙে ৬০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। গত সপ্তাহে বেশির ভাগ সবজির কেজি ছিল ১০০ টাকার ওপরে। তবে শীতের আগাম সবজি শিমের দাম কিছুটা বেশি, প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৪০ টাকা। ফুলকপি প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০-৭০ টাকা দরে। তবে শাকের দাম এখনও চড়া। গতকাল লালশাকের আঁটি ২৫-৩০ টাকা এবং লাউশাক ও পুঁইশাক ৪০-৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। লেবুর দাম অনেকটা নাগালের মধ্যে, মাঝারি আকারের প্রতি ডজন লেবু বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। কমতির দিকে কাঁচামরিচের বাজার। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা দরে। ব্যবসায়ীরা জানান, এক সপ্তাহ আগে পণ্যটির দাম আরও বেশি ছিল। গত বছর এই সময়ে আলুর বাজারে অস্থিরতা ছিল। এবার তেমন পরিস্থিতি না হলেও আলুর বাজার চড়া, প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা দরে।
শুল্কছাড়ের প্রভাব পড়ছে না
নিত্যপণ্যসহ শাকসবজির দাম যে কিছুটা কমেছে তার অন্যতম কারণ হলো- পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য শুল্কছাড় দিয়েছে। কিছু পণ্যের দামে এর সুফল মিললেও ভোজ্যতেল ও চিনির দাম কমেনি, উল্টো বাড়ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ড্রাম (২০৪ লিটার) পাম অয়েলের দাম বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৯০০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতি লিটার পাম অয়েল বিক্রি করছেন কমবেশি ১৫০ টাকা দরে। সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রতি লিটার পাম অয়েলের দর ছিল ১৪০ টাকার আশপাশে। সে হিসাবে লিটারে পণ্যটির দাম বেড়েছে ১০ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, খোলা সয়াবিনের দরও লিটারে ৫ টাকা বেড়েছে। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৫৩-১৫৬ টাকা দরে।
একই অবস্থা চিনির দামেও। চলতি মাসে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিশোধিত চিনি আমদানিতে শুল্ক টনপ্রতি ৬ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এতে চিনির দাম কমার কথা। কিন্তু বাজারে চিনির দাম কমেনি। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ২৫০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা দরে। খুচরায় এক কেজি চিনি কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে ১৩০ টাকা!
এই দুটো পণ্য উদাহরণ মাত্র। ফলমূলসহ এমন কোনো পণ্য নেই যেখানে মূল্যবৃদ্ধির খড়গ পড়েনি। এতে নিম্নআয়ের মানুষসহ মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠলেও ব্যবসায়ীদের যেন কোনো বিকার নেই। একইসাথে রাজনৈতিক দলসমূহও এক্ষেত্রে যেন মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
বাজারদরের আগুন নেভানোর উপায় কী
দেশের তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদকরা বাজারদরের অগ্নিকাণ্ড থেকে কোনো সুবিধা পান না। এটা দিবালোকের মতোই সত্য। তবে এর থেকে ফায়দা লুটে নেন মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা। তারাই কয়েক হাত ঘুরিয়ে এবং সিন্ডিকেট করে বাজারে আগুন লাগিয়ে থাকেন। এদের কাছে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। ব্যবসা একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা হলেও তাদের কাছে ব্যবসা টাকা কামানোর মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়। এজন্য জনগণের গলা কাটা ব্যতীত সিন্ডিকেটের আর কোনো বিষয় মাথায় থাকে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পেতে হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক দলের মনিটরিংও আবার চালু করতে হবে। ৫ আগস্টের পর প্রথম কয়েকদিন শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক দলের মনিটরিংয়ের কারণেই দাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো আরও একটি কাজ করতে পারে। সেটি হলো- প্রত্যেকটি দল বা বড় দলগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটি (দমকল বাহিনী) তৈরি করতে পারে। এই কমিটির কাজ হবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দেশের প্রতিটি বাজারে এক বা একাধিক ন্যায্যমূল্যের দোকান দেওয়া। উৎপাদক থেকে সরাসরি সংগ্রহ করে এ বাজার ব্যবস্থাপনা করতে পারলে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কিছুটা হলেও ধাক্কা খাবে। তবে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলেরই এসব নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা বা বিকার নেই। এখন তারা বলতেও পারে যে, এভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা করা তো রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ নয়। হ্যাঁ, এটা সত্য। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অনেক কিছুই নিয়ম ভেঙে করতে হয়। জনজীবন দুর্বিসহ অবস্থা থেকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে এখানেও প্রচলিত নিয়ম ভাঙা যেতে পারে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে, সরকার এবং ছাত্র-জনতার কঠোর মনিটরিং বাদ দিয়ে এসব করতে হবে। বরং কঠোর মনিটরিং জোরদারের পাশাপাশি যতভাবে সম্ভব সরকারের সাথে রাজনৈতিক ও বিপ্লবী ছাত্র জনতাকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে। মোটকথা হলো- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি সবার মৌলিক এজেন্ডার মধ্যে নিয়ে আসার বিকল্প নেই।
এমন একটি উদ্যোগ ইতিমধ্যে কুমিল্লার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গ্রহণ করেছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কুমিল্লায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে চালু হয়েছে ন্যায্যমূল্যের বাজার। শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার পূবালী চত্বরে এই নিত্যপণ্যের বাজার বসিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ‘কৃষক-জনতা জিন্দাবাদ, সিন্ডিকেট মুর্দাবাদ’ স্লোগানে বাজারে চলে প্রথম দিনের বেচা-কেনা। সেখানে প্রতিটি ডিম ১১ টাকা ৮০ পয়সায়, লাউ প্রতি পিস ৩০ টাকা, কচুর লতি ৫০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, বেগুন ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৩৫ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, পটল ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এছাড়া আলু প্রতি কেজি ৫৫, পেঁয়াজ ১০০ ও রসুন ২১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। সবজি কিনতে আসা ক্রেতা বলেন, “শিক্ষার্থীরা তরকারিসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছে কম দামে। তাই কিছু তরকারি কিনেছি। এমন উদ্যোগে আমরা আনন্দিত।” বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লার সমন্বয়ক মো. দোলোয়ার হোসেন বলেন, “সবজিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে না আসা পর্যন্ত আমাদের এই কার্যক্রম চলবে। আমরা সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে চাই।’’
শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগকেই রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টরা চাইলে দেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে পারেন। এতে কিছুটা হলেও জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে। এক্ষেত্রে ৫০০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করা কসাই খলিলও মডেল হতে পারেন। এর পাশাপাশি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, মজুদদার ও ফড়িয়া কারবারীদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনভাবেই সিন্ডিকেটের কাছে সরকারের সংশ্লিষ্টদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করার সুযোগ নেই। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতা যেভাবে সোচ্চার ছিল, ঠিক সেভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশবাসীকে সোচ্চার থাকতে হবে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে সরকারের সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হওয়ার বিকল্প নেই।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







