জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণার পর বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বহুপাক্ষিক সহযোগিতা কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রোববার (১১ জানুয়ারি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ইউএনএফসিসিসি, আইপিসিসি ও অন্যান্য জলবায়ু সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, নীতিগত সমর্থন ও নৈতিক অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারত। যুক্তরাষ্ট্র এসব সংস্থা থেকে সরে গেলে জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষতিপূরণমূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, লিঙ্গসমতা ও মানবিক সহায়তায় কাজ করা বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংস্থা মার্কিন সহায়তায় প্রকল্প পরিচালনা করে আসছিল।
প্রভাব আগেই টের পেয়েছে বাংলাদেশ
এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশে ইউএসএআইডি অর্থায়িত বহু প্রকল্প স্থগিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলার মার্কিন সহায়তা পেয়ে আসছিল। এই সহায়তা খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণতন্ত্র, পরিবেশ ও রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে রোহিঙ্গা সহায়তা ছাড়া অন্যান্য প্রায় সব খাতে মার্কিন অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান অর্থায়নকারী দেশ সরে গেলে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ সরাসরি খুব বড় সহায়তা না পেলেও বাণিজ্য, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে যে সুরক্ষা পেত, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের নৈরাজ্য তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়ানোর প্রতীকী মূল্যও অনেক বড়। আমেরিকা সরে গেলে অন্য ধনী দেশগুলোও অর্থায়ন কমানোর অজুহাত পেতে পারে। এতে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে অর্থায়ন ও ঐক্য দুটোই সংকটে পড়বে।
বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দুর্বল হলে বিশ্ব আবারও ‘ব্লক পলিটিকস’ বা জোটভিত্তিক রাজনীতির দিকে ফিরে যেতে পারে, যা অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা জলবায়ু তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যে বৈশ্বিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থায় পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।








