১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকেলে ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় নতুন একটি রাজনৈতিক দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পরবর্তীতে সেই দলের নাম পরিবর্তন হয়ে জন্ম হয়েছে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ এর।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠানে এসে আওয়ামী লীগ জন্ম, ইতিহাস এবং অবদান নিয়ে আলোচনা করেন দলটির উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য মোজাফফর হোসেন পল্টু ও মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার এবং প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) এর মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ।
এসময় পাকিস্তান আন্দোলন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের জন্ম ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন মোজাফফর হোসেন পল্টুসহ অন্যরা।
মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, মূলত পাকিস্তান আন্দোলনের পর যখন পাকিস্তান ভাগ হলো তখন থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের ভিন্ন রূপ দেখতে পায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ এই অঞ্চলের প্রগতিশীলরা। এরপর থেকে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে তাদের আগ্রহ হারাতে থাকে। আর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠে। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ গঠন করা হয়।
তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরে ঢাকায় মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলানা আকরাম খান এবং খাজা নাজিমুদ্দিন।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের বিষয়ে তারা বলেন, মূলত সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী যে প্রোগ্রেসিভ নেতারা ছিলেন, তারা তখন সেখানে নিজেদের অবহেলিত মনে করছিলেন। তখন তারা মোঘলটুলিতে ১৫০ নম্বর বাড়িতে একটি কর্মী শিবির স্থাপন করেন। সেখানে তারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা চিন্তা করেন। কলকাতা থেকে এসে শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সাথে যুক্ত হন।
তবে মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ হওয়ার পিছনে রয়েছে আরও বেশ কিছু কারণ। এর মধ্যে প্রধান কারণ ছিল, অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার ৬ বছরের মাথায় ১৯৫৫ সালের সম্মেলনে অসাম্প্রদায়িক রূপ দিতে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
১৯৫৫ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়।
মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, আইয়ুব খানের সকল ষড়যন্ত্রকে ভুল প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধুকে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে বাংলার মানুষ। এরপর ইয়াহিয়া খানের প্রবল আগ্রাসন থেকেও এই অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করেছে বঙ্গবন্ধু। মূলত বাংলার মানুষের ঐক্য এবং চাওয়াতেই সবসময় আওয়ামী লীগ আজও নেতৃত্বের সারথি হয়ে আছেন।
জাফর ওয়াজেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ একে অপরের প্রতিচ্ছবি। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে কল্পনাও করা যায় না। শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় দল এবং সাধারণ মানুষের কথা মাথায় নিয়ে কাজ করেছেন।
আওয়ামী লীগের উত্থান নিয়ে একটি বই লিখেছেন লেখক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বলছেন, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরে ঢাকায় মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মাওলানা আকরাম খান এবং খাজা নাজিমুদ্দিন।
তখন টাঙ্গাইলে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ পদত্যাগ করার কারণে শূন্য হওয়া একটি উপনির্বাচনে দুই দফায় মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হক। কিন্তু তাদের দুজনের নির্বাচনী ফলাফলই অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
তখন তারাও এসে এই মুসলিম কর্মীদের সঙ্গে মিলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার কথা ভাবতে শুরু করেন। তারা একটি সভা ডাকেন। সেই সভা ডাকার প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান। কিন্তু সেই সভা করার জন্য কোন অডিটোরিয়াম পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন কে এম দাস লেনের কাজী হুমায়ুন রশীদ তার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে সভা করার আহ্বান জানান।
সেখানেই ২৩ জুন বিকেলে আড়াইশো-তিনশো লোকের উপস্থিতিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী সেই দলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
সেই সঙ্গে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’, যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, দলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি থাকায় পরবর্তীতে কেউ কেউ আপত্তি করছিলেন। এ নিয়ে দলে বেশ একটি বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যে মুসলিম শব্দটি থাকবে নাকি থাকবে না।
তখন হিন্দু এবং মুসলিম আসনে আলাদাভাবে নির্বাচন হতো। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় একটা সমঝোতা হয়েছিল যে, এই দলটি একটি অসাম্প্রদায়িক দল হবে। ওই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায় যুক্তফ্রন্ট, যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খেলাফত পার্টি আর নেজামে ইসলামী পার্টির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিল ১৪৩টি আসন।
যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
মহিউদ্দিন বলেন, যদিও মওলানা ভাসানী দলকে অসাম্প্রদায়িক করতে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য জোর দিচ্ছিলেন, কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চাইছিলেন যে মুসলিম শব্দটি থাকুন। কারণ তার ভয় ছিল, এটা বাদ হলে পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা কমে যাবে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ আওয়ামী মুসলিম লীগে যে কাউন্সিল হয়, সেখানে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। ফলে অমুসলিমরাও এই দলে যোগ দেয়ার সুযোগ পান। তবে পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দুইটি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার হতে শুরু করে।







