এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
নেপালে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানার মাত্র ১০ মিনিট আগে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে তাদের জীবন বাঁচিয়েছেন একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের উঁচু এলাকায় চলে যেতে বলেন তিনি। এমনকি শিক্ষার্থীভর্তি বাসগুলোকে ঘুরিয়ে নিরাপদ এলাকায় চলে যাওয়ার নির্দেশও দেন।
রোববার (৩০ অগাস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ এই তথ্য জানায়।
নেপালের নুয়াকোটের ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বিবিসিকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১০ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ৩টা ২৫ মিনিট) কয়েক মিনিটের মধ্যে চারটি ফোন পান তিনি। প্রত্যেক ফোনেই ভয়াবহ বন্যার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪২৬ জন।
পরপর পাওয়া সতর্কবার্তাগুলো থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন দাওয়াদি। এরপর আর দেরি না করে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
দাওয়াদি বলেন,‘আমরা যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিতাম, আরও ১০ মিনিট দেরি হলে আজ শিক্ষার্থীসহ আমাদের কেউই হয়তো আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না।’
বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে চারজন ভিন্ন ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুলে এসে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার কথাও জানান।

দাওয়াদি বলেন, ‘একজন অভিভাবক এসে আমাকে বললেন, বড় বন্যা আসছে। তিনি মেয়েকে নিতে এসেছেন।’
তার ভাষায়, কোনো শক্ত কারণ ছাড়া সাধারণত অভিভাবকেরা হঠাৎ স্কুলে এসে সন্তানকে নিয়ে যেতে চান না। তাই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাননি।
‘আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর দেরি করা যাবে না। বন্যা না এলেও সর্বোচ্চ এক দিনের ক্লাস নষ্ট হতো,’ বলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে পেরে গর্বিত বলেও জানান প্রধান শিক্ষক।
বুধবার নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস আঘাত হানে। তীব্র স্রোত ও কাদামাটিতে স্কুল ভবনটিও মাটি ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে।
দাওয়াদি জানান, নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি ছাত্রাবাস ভবনও পানির স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায়।
শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি।
১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউনিশা আমাত্য বন্ধুদের সঙ্গে স্কুল থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। বিবিসিকে তিনি বলেন,‘আমরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচে গেছি।’
বন্যা আসার ঠিক আগে তারা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছিল। শিক্ষকরা এক জায়গায় জড়ো হলেও শুরুতে কী ঘটছে তা বুঝতে পারেননি। প্রায় পাঁচ মিনিট পর শিক্ষকরা এসে বন্যার খবর জানিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি চলে যেতে বলেন।
বন্যার খবর শুনে একজন শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে যান। অন্যদিকে অনেকে পরিস্থিতিকে প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেননি এবং গণিত ক্লাসে থাকা সহপাঠীদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ইউনিশা ও তার বন্ধুরা স্কুলের পেছনের একটি পথ দিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটে যান।
তিনি বলেন, ‘আমি দ্রুত হাঁটতে পারছিলাম না। আমার বন্ধুরা আমাকে পাহাড়ের দিকে উঠতে সাহায্য করেছে। আমরা তখন নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলাম।’
স্কুলের পেছন দিকের একটি সরু মই দিয়েও তাদের বের হতে হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই স্কুলের সামনে থাকা স্থানীয় বাজারটি চোখের সামনে পানিতে ভেসে যায়।
ইউনিশা বলেন, ‘জুতায় যদি ভালো গ্রিপ না থাকত, আমি পড়ে যেতে পারতাম। যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীসহ অন্যরাও নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার জন্য একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছিল।’
অন্য একটি পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা কয়েকজন পানির স্রোতে ভেসে গেছেন বলেও তিনি জানান।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা প্রথমে কয়েকশ মিটার ওপরে উঠে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। পরে তারা পাশের একটি গ্রামে চলে যান।
বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এবং যান চলাচল বন্ধ থাকায় অনেকে দুই রাত সেখানে আটকে ছিলেন। পরে উদ্ধারকারী দল তাদের কাছে পৌঁছায়।
প্রধান শিক্ষক দাওয়াদি এবং ইউনিশা দুজনের বাড়িই স্কুলের নদীর ওপারে। শেষ পর্যন্ত তাদের হেলিকপ্টারে করে নিজ নিজ গ্রামের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সন্তান ও স্বজনদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ইউনিশার মা সাবিনা কুমারী শ্রেষ্ঠা জানান, তিনি বারবার মেয়ের ও স্বামীর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাননি।
ইউনিশার বাবা যুবরাজ আমাত্য খবর পেয়েই স্কুলের দিকে রওনা হন।
তিনি বলেন, ‘বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আমি মেয়ের নম্বরে ফোন করি। কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন ভয় পেয়ে যাই।’
স্কুলের দিকে যাওয়ার পথে ত্রিশুলি বাজারের পুরো এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যেতে দেখেন তিনি। তখন তার মনে হয়, মেয়ে হয়তো আর বেঁচে নেই।
‘আমি ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। স্কুটার থামিয়ে দিই। চারদিকে পানি, কিন্তু মেয়েকে ছাড়া ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারছিলাম না,’ বলেন তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা মেয়ের কোনো খবর না পেয়ে বারবার ফোন করতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে ফোনটি সংযোগ হয় এবং ইউনিশা বাবার ফোন ধরেন।
বাবা বলেন, ‘অবশেষে আমার মেয়ে ফোন ধরল। আমি নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। আমার সঙ্গে থাকা দুই আত্মীয়ও কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন।’
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর পর বাবার ফোন পাওয়ার মুহূর্তটির কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইউনিশা।
তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের ওপরে পৌঁছানোর পর বাবার ফোন পাই। তিনি কাঁদছিলেন। তখন আমি কোনো কথাই বলতে পারিনি।’
এদিকে বাড়িতে মেয়ের ফেরার অপেক্ষায় উৎকণ্ঠায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
ইউনিশার মা বলেন, ‘আমার ছোট মেয়েটিও ঘুমাতে পারেনি। তবে তিন দিন পর শুক্রবার যখন তাকে দেখতে পেলাম, খুব ভালো লেগেছে। আমি খুব খুশি এবং স্বস্তি পেয়েছি।’
ভয়াবহ বন্যা থেকে বেঁচে গেলেও এখন নিজের ভবিষ্যৎ পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত ইউনিশা।
তিনি বলেন, ‘এখন আমার পরবর্তী পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। যদি আমাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে পুরোনো বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হবে এবং নতুন বন্ধু তৈরি করতে সমস্যায় পড়ব। আমার ভবিষ্যৎ পড়াশোনা নিয়ে আমি দুঃখিত।’
স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি মনে করেন, আরও কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থা থাকলে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারতেন।
তিনি বলেন, সাইরেন ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তা থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও সহজ হতে পারত।
তবে নিজের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই বড় বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।
দাওয়াদি বলেন,‘আমি যদি ক্লাসের সময় শেষ হওয়ার পর স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতাম, তাহলে হয়তো কিছুই অবশিষ্ট থাকত না শুধু সকাল সাড়ে ৯টায় স্কুলের ঘণ্টা বাজত।’










