পবিত্র রমজান মাসে জনসাধারণের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সরকারের ‘সূলভ মূল্যে’ ডিম, দুধ ও মাংস বিক্রি কার্যক্রমের প্রথম দিনে দেখা গেছে নানা অব্যবস্থা। মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর ২০টি স্পটে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আশা জাগালেও সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ে ও নির্ধারিত স্থানে আসেনি গাড়ি এবং ছিলো পণ্য সঙ্কটও। তবে শুরুর দিনে যারাই পণ্য পেয়েছেন তারা স্বস্তি জানিয়েছেন।
দিনের শুরুতে খামারবাড়ী (ফার্মগেট) স্পটে গিয়ে দেখা যায়, সকাল নয়টায় পণ্যবাহী ফ্রিজিং গাড়ি নির্ধারিত স্থানে থাকার কথা থাকলেও গাড়ি এসেছে সাড়ে ৯টায়। তবে এখানকার বিক্রি কার্যক্রম ছিলো শৃঙ্খলার মধ্যে। পর্যায়ক্রমে লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে যার যে পণ্য প্রয়োজন, সেই পণ্যের জন্য টাকা পরিশোধ করার পর একটি স্লিপ দেওয়া হচ্ছে। সেই স্লিপ নিয়ে গাড়িতে থাকা দায়িত্বরত ব্যক্তিকে দেওয়া হলেই মিলছে চাহিদা অনুযায়ি পণ্য।
মনিপুরী পাড়ার বাসিন্দা আসাদুল্লাহ সূলভ মূল্যের বিক্রয় কেন্দ্র থেকে গরুর মাংস, দুধ আর ডিম কিনেছেন। তিনি জানান: গত কয়েকদিনে গণমাধ্যমের খবরে তিনি জানতে পেরেছেন আজ শুক্রবার থেকে খামারবাড়িতে সূলতমূল্যে ডি-দুধ-মাংস বিক্রি শুরু হবে। কিছুটা কম দামে পাওয়ার আশায় এসেছেন চাহিদা মতো পণ্য কিনতে। পণ্য কিনে সন্তুষ্টির কথা জানান তিনি।
খামারবাড়ীর এ বিক্রয়কেন্দ্রে ১০০ কেজি গরুর মাংসের পাশাপাশি বিক্রির জন্য আজ আনা হয়েছে ৭০ কেজি মুরগি, ৭ কেজি খাসির মাংস, ২২০০টি ডিম এবং ১৭০ লিটার দুধ।
জাপান গার্ডেন সিটি (মোহাম্মদপুর) স্পট পরিদর্শনে দেখা গেল, জাপান গার্ডেন সিটির সামনে নির্ধারিত স্থানে মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ফ্রিজিং গাড়িটি নেই। কিছুটা দূরে এগিয়ে সূচনা কমিউনিটি সেন্টার, আদাবর এলাকায় গাড়িটির দেখা মিললো। নির্ধারিত জায়গায় গাড়ি না থাকার কারণ জানতে চাইলে সেখানকার দায়িত্বরত একজন স্বেচ্ছাসেবী জানালেন: ওইখানে দাঁড়াতে কিছুটা সুবিধা হওয়ায় এখানেই দাঁড়িয়েছি।
কিন্তু নির্ধারিত জায়গায় না দাঁড়ানোয় এই বিক্রয় কেন্দ্রে ক্রেতাদের তেমন একটা ভিড় নেই বললেই চলে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রয় কর্মী বললেন: নামাজের পর হয়তো বেচাকেনা বাড়বে। আর কয়েকদিন গেলেই লোকজন জেনে যাবে এখানে বিক্রি করা হচ্ছে, তখন আর সমস্যা হবে না।
এই বিক্রয় কেন্দ্রের জন্য ৯০ কেজি গরুর মাংস, ৫০ কেজি মুরগি মাংস, ৬ কেজি খাসির মাংস, ৭০ লিটার দুধ ও ১৫০৯টি ডিম আনা হয়েছে।
বসিলা পয়েন্টে গিয়ে কোন গাড়ির দেখা পাওয়া না যাওয়ায় দায়িত্ব প্রাপ্ত মনিটরিং কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আনোয়ার সাহাদাৎ-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তিনিও জানেন না গাড়িটি কোথায়। কিছুক্ষণ পর তিনি ফোন করে জানান, গাড়ির ড্রাইভারের নম্বর বন্ধ তাই তিনিও বলতে পারছেন না গাড়িটি কোথায়! বসিলা ব্রিজের আশ-পাশের লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়: এই দিকে সকাল থেকে তারা কোন গাড়ি দেখেন নাই।
পরে মনিটরিং কর্মকর্তা টেক্সট করে জানান, বসিলার নির্ধারিত গাড়িটি মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে ময়ুর ভিলার বিপরীতে অবস্থান করছে। সেখানে গিয়ে গাড়িটি পাওয়াও গেলো। গাড়িটি বসিলা থাকার কথা থাকলেও মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে কেনো, জানতে চাইলে একজন বিক্রয় কর্মী জানালেন, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে এই রাস্তা বসিলার দিকে গেছে তাই আমরা এখানে বসেছি! আধা কিলোমিটার দূরে জাপান গার্ডেন সিটিতে অবস্থান করছে আরেকটি গাড়ি। এ অবস্থায় বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করলে কেউ কিছু বলতে পারেননি।

উপস্থিত ক্রেতা আব্দুর রব পেশার একজন শ্রমিক। চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদককে দেখে এগিয়ে এসে নিজ থেকেই বললেন: দেখেন লাইনে কোন নিম্ন আয়ের মানুষ আছে? এখানে দরিদ্র মানুষ কোথায় পাবে? দরিদ্র মানুষ যেখানে থাকে, তারা সেখানে যায় না। আমি চাই তাদের সঙ্গে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে। দেশে সব কিছু যেনো বড় লোকের জন্য।
সরকারের এ প্রকল্পটি নিম্ন আয়ের মানুষের রমজানে পুষ্টি চাহিদা চিন্তা করে, বিষয়টি মনিটরিং কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আনোয়ার সাহাদাৎকে মনে করিয়ে দিলে তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান: আগামীকাল (২৫ মার্চ) থেকে গাড়ি যেন বসিলা পয়েন্টে থাকে, সে বিষয়টি তিনি দেখবেন।
এই পয়েন্টের জন্য ৪০ কেজি গরুর মাংস, ৪০ কেজি মুরগির মাংস ও ১২০০ ডিম আনা হয়েছে। তবে কারও যদি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি পণ্য প্রয়োজন হয়, এ স্পট থেকে তা দেওয়া হচ্ছে না। তিনটি পণ্য একসঙ্গে নিতে হবে।
লুকাস (নাখালপাড়া) এই পয়েন্টে সকাল ১১টায় গিয়ে মৎস ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গাড়ি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় দোকানীরা জানান, অল্প কিছু পণ্য নিয়ে গাড়ি এসেছিলো। তা বিক্রি শেষে কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছে।
পণ্য কিনতে এসে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে অনেক ক্রেতাকেই। মুস্তফা আমীর একজন বেসরকারি চাকুরিজীবী তিনি বেলা ১১টায় এসে আর গাড়ি পান নাই। হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলে: আশা করে শুক্রবারের সকালে এসেছিলাম গরুর মাংস কিনবো বলে। এখন শুনছি সব বিক্রি শেষ। আমি হতাশ, এতো দ্রুত কিভাবে পণ্য শেষ হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রাঙ্গণে রমজানে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। এবছর প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৪০ টাকা, খাসির মাংস প্রতি কেজি ৯৪০ টাকা, ড্রেসড (চামড়া ছাড়া) ব্রয়লার প্রতি কেজি ৩৪০ টাকা, দুধ প্রতি লিটার ৮০ টাকা এবং ডিম প্রতিটি ১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।







