ধরা যাক আপনার এক ভাইয়ের নাম ছিল আইনস্টাইন। চাকরি বা অন্য কোনো ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্ন করা হলো, আইনস্টাইন কে ছিলেন? এর জবাবে আপনি বললেন, আইনস্টাইন আমার ভাই ছিলেন!
আইনস্টাইন সম্পর্কে একটা গল্প আছে। তাকে নাজেহাল করার জন্য একবার একদল তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, বলুন তো বিজ্ঞানী, এক মাইলে কত কিলোমিটার হয়? আইনস্টাইন জবাব দিলেন, জানি না। জবাব শুনে প্রশ্নকারীরা হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, এক মাইলে কত কিলোমিটার—বিজ্ঞানী তা-ই জানে না। আইনস্টাইন তখন বলেন, এত ছোটখাট বিষয় মাথায় রেখে মস্তিষ্ক ভরার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ এই সামান্য বিষয় বইয়ের পাতা ওল্টালেই জানা যায়। কারণ আমাকে এর চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়।
সেরকমই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হয় বলে ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি শোবিজ অনুষ্ঠানে একজন অংশগ্রহণকারীকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, H2O মানে কী? জবাবে তিনি বলেছেন, এই নামে ধানমন্ডিতে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। জবাব তো সঠিক। কারণ এই নামে ধানমন্ডিতে যদি একটি রেস্টুরেন্ট থাকে, তাহলে এর জবাব তো আইনস্টাইন কে ছিলেন তার জবাবের মতোই হবে।
তাছাড়া এত সামান্য বিষয় মাথায় রাখতেই বা হবে কেন? বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টালেই তো জানা যায়। এখন গুগল আছে। সেখানে সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। যেমন, H2O মানে লেখা হয়েছে: the chemical formula for water, ice or steam which consists of two atoms of hydrogen and one atom of oxygen. অর্থাৎ পানির রাসায়নিক নাম হচ্ছে H2O… মাধ্যমিক স্কুলের গণ্ডি যারা পেরিয়েছেন, তাদের অন্তত এই একটি লাইন মনে থাকার কথা। কিন্তু মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের ওই অংশগ্রহণকারী যেহেতু সাধারণ কেউ নন, ফলে তিনি H2O কী, এ প্রশ্নের জবাবে ধানমন্ডির একটি রেস্টুরেন্টের নাম বলেছেন, তাতে দোষের কী আছে!
এই প্রতিযোগিতায় আরেকজন অংশগ্রহণকারীর কাছে বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন,তোমাকে যদি তিনটা উইশ দেয়া হয়, ধরো একটা নিজের জন্য, একটা উইশ করতে পারবে ফ্যামিলির জন্য, অথবা একটা দেশের জন্য। তাহলে কোন উইশটা তুমি পছন্দ করবে? জবাবে সুন্দরী প্রতিযোগী বলেন, ‘অ্যাট ফার্স্ট অবশ্যই আমার কান্ট্রির জন্য উইশ করব। বাংলাদেশের একটা লংগেস্ট সি বিচ আছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুন্দরবন। অনেক বিউটিফুল। নেক্সট আমাদের দেশে অনেক সুন্দর সুন্দর পাহাড় পর্বত রয়েছে। আমি এগুলোকেই উইশ করব।’
প্রশ্ন করার আগে ‘গুড ইভিনিং’ বলে পরে আবার ‘গুড নাইট’ উল্লেখ করে প্রশ্ন করা বিচারক জবাব শুনে বিব্রত হন। তিনি তখন প্রতিযোগীকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি উইশ করা বলতে কী বোঝায় তিনি বোঝাতে পেরেছেন কি না? এরপর প্রতিযোগী বলেন, ‘স্যরি ম্যাম বুঝতে পারছি না।’
সুন্দরী প্রতিযোগী যে ‘উইশ’ শব্দটি প্রথম শুনেছেন তাতে সন্দেহ নেই। অবশ্য এতে দোষেরও কিছু নেই। কারণ বিচারক প্রশ্ন করার সময়ই বলেছেন যে, তিনি কোনো ইন্টেলেকচুয়াল (বুদ্ধিদীপ্ত) প্রশ্ন করবেন না। সাধারণ প্রশ্ন করবেন। তো সেই সাধারণ প্রশ্নের জবাব প্রতিযোগী যা দিয়েছেন, তা-ই সই।
বিষয়গুলো নিয়ে ফেসবুকে অনেকে সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ এনাদের এইসব প্রশ্নের জবাব শুনে দুঃখিত, লজ্জিত, মরে যেতে ইচ্ছে করছে — ইত্যাদি লিখেছেন। কথা হলো, আপনার মরে যেতে ইচ্ছে হবে কেন? যাদেরকে ওনারা যে প্রক্রিয়ায় এবং যেসব বিবেচনায় বাছাই করে মিস ওয়ার্ল্ডের মতো একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পাঠানোর জন্য নিয়ে আসেন — তারা H2O মানে ধানমন্ডির রেস্টুরেন্ট আর উইশ মানে পাহাড়-জঙ্গল কিংবা সমুদ্রের কথা বলবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না।
স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছরও এই প্রতিযোগিতাটি নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। নানা বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়ে জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলকে বাদ দিয়ে ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ হয়েছিলেন জেসিয়া ইসলাম নামে একজন। এবারের প্রতিযোগিতার পরও একটি শীর্ষ দৈনিকের খবরে বলা হচ্ছে, ‘সারা দিন ধরে শোবিজের আকাশে একটাই গুঞ্জন, ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ হবেন জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী। অনুষ্ঠানস্থলে ঢোকার পরও অনেকেই বললেন, ফলাফল তো জানাই আছে, ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ ঐশী। শেষ পর্যন্ত গুঞ্জনই সত্যি হলো। ‘মিস ওয়ার্ল্ড ২০১৮’–এর যে আসর চীনে বসবে, তাতে এই ঐশীই বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
প্রশ্ন হলো, সুন্দরী বা বিউটি বলতে আমরা শুধু শরীরের গঠন আর চামড়ার রঙ বুঝি কি না? কারণ মিস ইউনিভার্স কিংবা মিস ওয়ার্ল্ডের আসরে আমরা যেসব নারীকে দেখি, যেসব কঠিন প্রশ্নের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর আর
প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখি — তার সাথে তুলনা করলে আমাদের এই মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় হবে — তার খুব ভালো জবাব বোধহয় ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের রাজদর্শন হলে প্রতিযোগীরা দিয়েছেন। শুধু সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরাই নন, যারা এই প্রতিযোগিতার বিচারক, তাদের যোগ্যতা নিয়েও কেউ যদি প্রশ্ন তোলেন, সেটি বোধ করি খুব অন্যায় হবে না।
আইনস্টাইন কিংবা H2O বিষয়ক আরেকটা পরিচিত গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করা যাক। স্কুল পরিদর্শনে এসেছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তারা কী প্রশ্ন করেন এই ভয়ে এক ছাত্র, যে কানে কম শোনে (স্থানীয় ভাষায় কানা বলা হয়) টয়লেটে গিয়ে লুকিয়েছে। ক্লাসে ঢুকে পরিদর্শক ছাত্রদের নানা প্রশ্ন করছেন। শিক্ষকরা তাদের কী পড়ান, সেটি যাচাই করছেন। এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করা হলো, কানাডা কোথায়? সে বললো, স্যার সে তো টয়লেটে লুকিয়েছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







