এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
মৃত্যুরও এক সময় ভাষা থাকে। কান্নারও থাকে প্রতিধ্বনি। কিন্তু যখন একটি সমাজ বারবার মৃত্যুর সংবাদ শুনতে শুনতে আর চমকে ওঠে না, যখন শত শত প্রাণহানি কেবল সংবাদপত্রের একটি সংখ্যা হয়ে যায়, তখন বুঝতে হয় বিপদ শুধু মানুষের জীবনে নয়, আমাদের বিবেকেও নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ কি আজ সেই পথেই হাঁটছে? দেশে একসময় প্রায় নির্মূলের পথে চলে যাওয়া হাম আবার ফিরে এসেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে সাত শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি মায়ের বুকফাটা কান্না, একটি বাবার ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একটি পরিবারের নিভে যাওয়া আলো। তবু জাতীয় আলোচনায় এই সংকটের গুরুত্ব কোথায়? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জনস্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান বার্তা কোথায়? এই প্রশ্নগুলো আজ আর রাজনৈতিক নয়; এগুলো মানবিক।
এদিকে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত। প্রাণহানি ঘটেছে, হাজার হাজার পরিবার ঘরছাড়া, পাহাড়ধসে মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেছে বহু মানুষের জীবনভর গড়ে তোলা স্বপ্ন। প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায় হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র কি অসহায় হতে পারে? একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র দুর্যোগকে ঠেকাতে না পারলেও প্রস্তুতি, দ্রুত সাড়া এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার দেখায়। সেই অঙ্গীকার কতটা দৃশ্যমান—সেটিই আজ বড় প্রশ্ন।
বর্ষা এলেই এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ফিরে আসে। হাসপাতালের শয্যা ভরে যায় রোগীতে। স্বজনেরা হাসপাতালের করিডোরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করেন, সুস্থতার দিন গোনেন, মৃত স্বজনের লাশ কাধে তুলে নেন ভারাক্রান্ত হৃদয়ে। সংবাদমাধ্যম মৃত্যুর সংখ্যা হালনাগাদ করে। তারপর? তারপর আবার নতুন দিনের নতুন শিরোনাম। যেন ডেঙ্গুও আমাদের কাছে একটি মৌসুমি সংবাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
রাজধানী ঢাকা কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে। কোটি মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, রোগ বালােই বাড়ছে, দুর্ভোগ চরমে পৌছেছে। অথচ প্রতি বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আমাদের বিস্মিতও করে না। যেন অকার্যকারিতাই হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা। এটাই যেন নাগরিক প্রাপ্তি।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিবর্তনটি সম্ভবত আমাদের ভেতরে ঘটছে, হদয়ে মননে, মগজে। আমরা আর মৃত্যু দেখি না; আমরা সংখ্যা দেখি। আমরা আর শিশুকে দেখি না; আমরা দেখি একটি পরিসংখ্যান। আমরা আর বিপর্যস্ত পরিবারকে দেখি না; আমরা দেখি একটি সংবাদ। যে সমাজে মানুষের জীবন সংখ্যায় পরিণত হয়, সেখানে রাষ্ট্রের জবাবদিহিও সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তখন মৃত্যুর হিসাব থাকে, কিন্তু শোকের কোনো রাষ্ট্রনীতি থাকে না; ক্ষতির পরিমাণ থাকে, কিন্তু বিবেকের কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে না। যা যান্ত্রিকতা এবং অমানবিকতার এক অনাকাঙ্খিত অপ্রত্যাশিত উদাহরন বৈ কিছু নয়।
রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা করা। উন্নয়নের সাফল্য, প্রবৃদ্ধির হার কিংবা অবকাঠামোর উচ্চতা—সবকিছুর মূল্য শূন্য হয়ে যায়, যদি একটি শিশুর প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু আমাদের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে স্থান না পায়। জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশ সুরক্ষা—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন খাত নয়; এগুলো মানুষের বেঁচে থাকার ভিত্তি।
তবে প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্রের নয়; প্রশ্ন আমাদেরও। আমরা কি এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে অন্যের মৃত্যু আমাদের স্পর্শ করে না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি শোকবার্তা লিখে, কয়েক ঘণ্টার আলোচনার পর আমরা কি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই না? আমরা কি ধীরে ধীরে কষ্টের প্রতিও অভ্যস্ত হয়ে উঠছি? একজন দার্শনিক বলেছিলেন, একটি সমাজের নৈতিক মানদণ্ড বোঝা যায়, তারা সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা দেখে। সেই মানদণ্ডে আজ আমাদের নিজেদেরই আয়নায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা দরকার।
সাত শতাধিক শিশুর মৃত্যু, বন্যায় ভেসে যাওয়া জনপদ, পাহাড়ধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া পরিবার, ডেঙ্গুতে প্রতিদিনের প্রাণহানি, জলাবদ্ধতায় অবরুদ্ধ নগরজীবন—এসব যদি আমাদের বিবেককে আর নাড়া না দেয়, তাহলে বিপদ শুধু জনস্বাস্থ্যে নয়, শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নয়; বিপদ আমাদের মানবিক অস্তিত্বে। আমাদের চিন্তার জগতেও প্রবেশ করেছে বিপদের ঘনঘটা। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রে নয়, মানুষের আস্থায়, ভালোবাসায়। সমাজের শক্তি সম্পদে নয়, সহমর্মিতায়, সহযোগিতায়। আর মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অনুভূতিতে।
সেই অনুভূতি যদি একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে ইতিহাস হয়তো লিখবে—আমরা শুধু মানুষ হারাইনি, হারিয়েছিলাম মানুষের মতো অনুভব করার ক্ষমতাও।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







