জেন-জি (জন্ম ১৯৯৭-২০১২) প্রযুক্তিনির্ভর প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রজন্ম। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্রুত ডিজিটালাইজেশন ও মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে এই প্রজন্মের জীবনযাপন, সামাজিক আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল আসক্তি ও মানসিক অবসাদ এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ‘অ্যাফোর্ড্যান্স’—যেমন অ্যাসিনক্রোনিসিটি (তাৎক্ষণিক জবাবের বাধ্যবাধকতা না থাকা) ও কিউ ম্যানেজেবিলিটি (নিজের ইমেজ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ)—তরুণদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের এক ধরনের মায়া তৈরি করে। ফলে তারা বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইন জগতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
রোববার ১ মার্চ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ৮ হাজারের বেশি কিশোরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১১-১২ বছর বয়সীদের মধ্যে সমস্যাজনিত মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার এক বছরের মধ্যে বিষণ্নতা, আত্মহত্যাপ্রবণতা ও ঘুমের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

সৌদি আরবে তরুণদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণ উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ স্মার্টফোন আসক্তিতে ভুগছেন, যা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও উদ্বেগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তিউনিসিয়ায় ৯৬০ কিশোরের ওপর জরিপে আসক্তির হার পাওয়া গেছে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আসক্ত কিশোররা দিনে গড়ে ৪৩৫ মিনিট (৭ ঘণ্টার বেশি) ফোন ব্যবহার করে, যেখানে অ-আসক্তরা ব্যবহার করে গড়ে ১৫৫ মিনিট।

স্ট্যাটকাউন্টার গ্লোবালস্ট্যাটসের ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪৯ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীর মধ্যে ৯১ দশমিক ৩ শতাংশই ফেসবুক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ১৮-২৪ বছর বয়সী ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ দশমিক ৬০ মিলিয়ন—যা তরুণদের অনলাইন নির্ভরতার একটি বড় চিত্র তুলে ধরে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০-১৯ বছর বয়সী প্রতি ৭ জনে ১ জন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ভিয়েতনামের ৪৪৭ জন স্বাস্থ্যবিজ্ঞান শিক্ষার্থীর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেট আসক্তি সরাসরি উচ্চমাত্রার বিষণ্নতা ও নিম্নমানের ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও উদ্বেগজনক। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট-এর ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ১৮-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই হার আরও বেশি, যেখানে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের প্রকোপ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল আসক্তি এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে।
মোবাইল আসক্তি কেবল একটি অভ্যাসগত সমস্যা নয়; এটি বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে জেন-জি প্রজন্মের এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্রিয় ভূমিকা, স্বাস্থ্যকর স্ক্রিন-টাইম নীতিমালা এবং সহজপ্রাপ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে তরুণদের জন্য বিকল্প সৃজনশীল ও সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো হলে অনলাইন নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়—বরং সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ।
সাহারা রবার্টসন, এমপিএইচ শিক্ষার্থী, ফার্মেসি এন্ড পাবলিক হেলথ ইন্ডিপেন্ডেট ইউনিভার্সিটি








