চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

‘মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ছাড়া দেশের কাছে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই’

মাহবুব রেজামাহবুব রেজা
৯:৪৪ অপরাহ্ণ ১৯, অক্টোবর ২০২২
সাক্ষাতকার
A A

একাত্তরের সাত মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পর তিনি ঢাকার হাতিরপুলে ছাত্র- যুবক- শ্রমিকদের অস্ত্রের ট্রেনিং দেয়া শুরু করলেন। ২৫ মার্চ সকালে পরিবার নিয়ে চলে যান নিজ এলাকা হবিগঞ্জের লাখাই। ২৬ মার্চ সকালে বুল্লা বাজারে তার নেতৃত্বে গঠন করা হয় সংগ্রাম কমিটি এবং তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে করা হয় কমান্ডার। লাখাইয়ের মানুষের কাছে তিনি আঞ্জু ভাই নামে সমধিক পরিচিত। এরপর নয়মাস যুদ্ধকে সংগঠিত করতে এই অকুতোভয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকাকে আজও হবিগঞ্জের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। দুঃখজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলে আজও তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।

একান্ত সাক্ষাৎকারে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ গনি তার রাজনীতি, ফেলে আসা জীবন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার স্মৃতিসহ যুদ্ধদিনের নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।

প্রশ্ন: আপনার শৈশব নিয়ে কিছু বলুন?
উত্তর: ১৯৪২ সালে হবিগঞ্জ ছিল আসামের অন্তর্ভুক্ত। আমার বাবার নাম গিয়াস উদ্দিন আহমেদ আর মার নাম ছিল জিগর চান বিবি। ছিলেন নিম্নবিত্ত কৃষক ঘরের সন্তান। দারিদ্রতার ভেতর তার বেড়ে ওঠা। ১৯০০ সালে হবিগঞ্জের দিকে মারাত্মক কলেরা দেখা দিয়েছিল। সেই কলেরায় বাবা তার বাবা-মাকে হারান। তখন তার খুব কম বয়স। বাবা পিতৃমাতৃহীন হয়ে পড়লে তাকে আগের চেয়েও অনেক কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার বাবা ছিলেন প্রচন্ড পরিশ্রমী মানুষ। আমরা ছোটবেলা থেকে বাবার দারিদ্র আর কষ্ট দেখে বুঝে গিয়েছিলাম আমাদেরকেও বাবার মত কষ্ট করতে হবে- নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কৃষক পরিবার ছিল তাই গিরস্থি করতাম। কোনো কিছুতেই বাবা নতি স্বীকার করার মানুষ ছিলেন না। বাবা খুব একরোখা ধরনের ছিলেন। কলেরায় বাবা-মারা যাবার পর বাবার ফুফুর বাড়িতে থেকে, কষ্টে-সৃষ্টে বড় হতে শুরু করেন। বাবা ছিলেন সৎ আর পরিশ্রমী। অল্প বয়সে বাবার বিয়ে হয়ে গেল। আগেকার দিনে মুখ দিবেন যিনি আহার দিবেন তিনি- ফলে আমাদের পরিবার বড় হয়ে উঠতে বেশি সময় নিল না। আমার সাত ভাই এক বোনের বড় সংসার। বাবার জমিজমা কম ছিল ফলে আমাদের ভাইদের কাজের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়তে হল আশেপাশে, দূরদূরান্তে। আমরা ভাইরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজকর্ম করে বাবাকে সাহায্য করি। কৃষক পরিবারের বিচিত্র রকমের কাজ করতে হতো আমাদের সব ভাইদের। জমি চাষ করা, বাঁশ কেটে নদীতে ভাসিয়ে আশেপাশের বাজারে গিয়ে তা বিক্রি করা, মনে আছে আমি বাজারে কেরোসিন তেলও বিক্রি করেছি সংসারের খরচের যোগান দিতে। সে সময়ে আমাদের পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।

প্রশ্ন: আপনার জন্ম হয়েছিল কবে? ছোটবেলা কিভাবে বেড়ে উঠেছেন?
উত্তর: আমার জন্ম ১৯৩৬ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি। ১৯৪৩ সালের কথা বলছি। আমি তখন ছোট। আমার পাঁচ নম্বর ভাই আশরাফউদ্দিন কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। আমার ভাই তখন ঢাকায় থাকতেন। এমই (মিডল ক্লাস) পাস করে তিনি ঢাকার নীলক্ষেতে থাকতেন। তখন নীলক্ষেত এলাকার আশপাশে কমিউনিস্ট পার্টির অনেকে থাকতেন- সে যুগে নীলক্ষেত এলাকাকে বলা হতো কমিউনিস্টদের আখড়া। শুনেছি, বড় ভাইয়ের সঙ্গে মনি সিংহ, জিতেন ঘোষ, জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিল মুখার্জি, খোকা রায়দের পরিচয় ছিল।

আমার সেই ভাই আমাদের এলাকার পতিত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিলেন। ফলে সেখানকার জোতদারদের রোষানলে পড়লেন তিনি। জোতদাররা তার বিরুদ্ধে কঠিন মামলা দিল। মামলা দেয়ার ফলে তিনি আত্মগোপনে চলে গেলেন। আমার দ্বিতীয় ভাই ইঞ্জিনিয়ার এম, এ করিম আগে থেকে দিনাজপুর ছিলেন। আশরাফ ভাই সেই ভাইয়ের কাছে চলে গেলেন- সেখানে প্রখ্যাত বাম নেতা এস,এ বারি এটি’র রাজনৈতিক শিষ্য হয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে তিনি আমাদের সঙ্গে এর তার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন।

এদিকে আমি বড় হয়ে উঠছি.। আমার তিন নম্বর ভাই ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদ ১৯৫০ সালে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পড়াশোনা শেষ না করে চাকুরিতে ঢুকে যান। আমার ছয় নম্বর ভাই এম, এ করিমকে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এবং আমাকে ১৯৫২ সালে হবিগঞ্জের গভ. হোস্টেলে রেখে চার বছর হাই স্কুলে পড়ান। ম্যাট্রিক পাস করে ১৯৫৭ সালে ঢাকায় এসে ভর্তি হই জগন্নাথ কলেজে। ১৯৫৯ সালের দিকে আমি থাকি ৫০ নারিন্দার এক মেসে- তারপর সেখান থেকে ভজহরি সাহা স্ট্রিটের এক মেসেও থেকেছি কিছুদিন। তখন পুরান ঢাকায় মেসবাড়ির প্রচলন ছিল। মফস্বল থেকে ঢাকায় পড়তে আসা গ্রামের ছেলেপেলেরা এসব মেসে থাকত। পুরান ঢাকার বেশ কয়েক জায়গায় মেসে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। আশরাফ ভাইয়ের দেখাদেখি আমিও ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছি। কলেজে পড়ার সময় থেকেই বুঝতে পারছিলাম দেশের রাজনীতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। মিটিং, মিছিল, প্রতিবাদ চলছে ছাত্রদের মধ্যে।

Reneta

ছোটবেলা থেকে আমার খরচের হাত লম্বা ছিল। অভাব, দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছি বটে কিন্তু হাত খুলে খরচ করার অভ্যোসটা যে কোত্থেকে আমার মধ্যে ভর করল তা বুঝতে পারিনি। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়ার বিল কাউকে দিতে দিতাম না- সব আমিই দিতাম। কেউ বিপদে পড়লে আমার ডাক পড়বে। মানুষের বিপদে-আপদে আমি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে নিজের কাছে ভালো লাগত। সে আমলে হবিগঞ্জ ছিল প্রত্যন্ত আর নিদারুণ অবহেলিত এলাকা। এলাকার ঘরে ঘরে ছিল অভাব-অনটন। ছোটবেলায় দেখেছি আশেপাশে কেউ অভাব-অনটনে কিংবা বিপদে পড়লে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কেউ সেই বিপদে পড়া মানুষটির পাশে এসে দাঁড়াতে পারত না- এই বিষয়টা তখন থেকেই আমার মধ্যে কাজ করত। আমার মনে হত যদি আমার কোনোদিন সামর্থ্য হয় তাহলে আমি মানুষের পাশে দাঁড়াব।

প্রশ্ন: ঢাকায় এলেন কবে?
উত্তর: জগন্নাথ থেকে বিএসসি পাশ করার পর প্রথমে বায়োলজি বিভাগে এবং পরে জুলজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পাই। ১৯৬৪ সালে আমার বেতন ছিল ২৫৯ টাকা। আমার জন্য এই টাকাটা ছিল অনেক টাকা। সে সময় আমার একটা ভেসপা ছিল। চাকরির বেতন পেয়ে পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে খাওয়ালাম। চাকরির পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলাম। ছয় দফা নিয়ে সারাদেশের মানুষ সংগঠিত হচ্ছে। জগন্নাথে চাকরি করার সময় কন্ট্রাক্টরদের সাথে আমার খাতির হয়ে গেল। ওরা কিভাবে কাজ করে তার দেখভালের দায়িত্ব ছিল আমার। আমি খুব ভালো করে তারা কিভাবে কাজ করে, কেমন করে শ্রমিকদের সঙ্গে মিলেমিশে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর কাজ শেষ করে- তাদের সবকিছু আমি লক্ষ্য করতাম। তারাও আমাকে খুব পছন্দ করত।

’৬৬ সালের শুরুতে আমি আমার কাজের ওখানে কাউকে কিছু না বলে দিনাজপুরে গেলাম। কয়েকদিন পর এসে দেখি আমাকে চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে চাকরি থেকে বাদ দেয়ার কারণ জানতে চাইলে অফিস আমাকে জানাল, কাউকে বলে না গেলে চাকরি থাকে কিভাবে? সে সময় আমার বিভাগের প্রধান ছিলেন জুলজি বিভাগের অধ্যাপক মহিবুল্লাহ। তিনি আমার রাজনৈতিক পরিচয় এবং সততা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন ফলে আমাকে কিছু দিনের মধ্যে আমার চাকরিতে পুনর্বাহল করেন। এদিকে চাকরি নেই- হুট করে আমি বিয়ে করে ফেললাম। হাত খালি থাকার ফলে সে সময় আমি দুই হাজার টাকায় আমার সাধের ভেসপাটাকে বিক্রি করে বিয়ের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করলাম।

বিয়ের পর আমি হাতিরপুলে ভাইয়ের বাসায় থাকি। ততদিনে আমি ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছি। তখন ন্যাপের সভাপতি ছিলেন ওয়ালি খান আর পূর্ব পাকিস্তানের ন্যাপের সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। ভাসানী সাহেবের সঙ্গে রাজনীতি করতে গিয়ে বুঝেছি রাজনীতি করতে গেলে সব বিষয়ে একটা লেবেল পর্যন্ত শিক্ষা থাকা চাই। জানাশোনার বিস্তৃতি আর দূরদর্শী জ্ঞান থাকতে হয়। ভাসানী সাহেবের মধ্যে সেসব বিষয়ের অনেক অভাব ছিল। তিনি আবেগ আর সরল বিশ্বাসে সব নিয়ে রাজনীতি করতে চাইতেন। ভাসানি সাহেবের আরও একটা বিষয়ের ঘাটতি ছিল তাহল পরিস্থিতি পরিবেশ বুঝে রাজনীতি করার সক্ষমতা তার একেবারেই ছিল না।

প্রশ্ন: আপনার ছাত্রজীবন কেটেছে কোথায়? ছাত্ররাজনীতি আর একাত্তরের যুদ্ধদিনের স্মৃতি নিয়ে কিছু বলুন।
উত্তর: সত্তুরের নির্বাচনের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল- আমরাও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে ছিলাম। নির্বাচনের এক মাস আগে আমি আর আমার বন্ধু বি, আর চৌধুরী গেলাম তখনকার ওয়ারীর আওয়ামী লীগ অফিসে, কর্নেল (অব.) এম, এ জি ওসমানীর পোস্টার আনতে তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা হল আমাদের। আমি বললাম, বঙ্গবন্ধু, ওসমানী সাহেব তো ভয় পাচ্ছে নির্বাচনে পাশ করবেন কিনা- এই চিন্তায়?

আমার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু বললেন, উনাকে বলে দিও উনি পাশ না করলে পূর্ব পাকিস্তানে কেউ পাশ করবে না।

একাত্তরের সাত মার্চ আমি রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণে কি যে যাদু ছিল তা জানি না- রেসকোর্সের ময়দানে আমরা তন্ময় হয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা, আমাদের কি করণীয়- তার সব বুঝে নিয়েছিলাম।

রেসকোর্স থেকে ফিরে এসে পরদিন থেকে আমিসহ অন্যরা হাতিরপুলে যুবকদের ট্রেনিং দিতে শুরু করলাম। তখন মকবুল চেয়ারম্যান ছিল ধানমন্ডি আওয়ামী লীগের সভাপতি। আমি ছিলাম ন্যাপের ধানমন্ডি থানার সভাপতি। তখন ফজলুল করিম ছিলেন আওয়ামী লীগের ঢাকার সভাপতি।

২৫ মার্চ সকালে আমি পরিবার নিয়ে Train green way তে হবিগঞ্জে চলে গেলাম। সকালে হাতিরপুলের বাসা থেকে বেরিয়ে দেখলাম সব মানুষ দলে দলে অজানা আতঙ্কে রাজধানী ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। আমি আমার বউ, এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে শায়েস্তাগঞ্জে গেলাম। তারপর সেখান থেকে কখনো বেবিট্যাক্সিতে কখনো রিকশায় কখনো পায়ে হেঁটে ভেঙ্গে ভেঙ্গে নয় মাইল অতিক্রম করে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম।

আমি গ্রামে ফিরেছি শুনে অনেকেই আমাদের বাড়িতে ছুটে এলো। পরদিন ২৬ মার্চ বুল্লা বাজার প্রাইমারি স্কুলের মাঠে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক জড়ো হলো। আমার নেতৃত্বে গঠন করা হলো সংগ্রাম কমিটি। লাখাইয়ের ছেলেবুড়ো সবাই মিলে আমাকে লাখাই থানার কমান্ডার নির্বাচিত করল। বঙ্আগবন্মিধুর সাত মার্চের ভাষণ অনুযায়ী থানায় থানায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠন কর- সেই সময় আওয়ামী লীগের থানা সভাপতি গা ঢাকা দিয়েছিল বিধায় লাখাই থানার সবাই মিলে আমাকেই সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত করল। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ কমান্ড কাউন্সিল যে বই ছাপায় সেই বইয়ের ৬৯ পৃষ্ঠায় আমার ছবি ছেপে দিয়ে আমার সম্পর্কে যে কথাগুলো লেখে তা হলো, ‘ লাখাইয়ের কৃতি সন্তান এম, এ, গনি সফল রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, চৌদ্দ দলের লিঁয়াজো কমিটির সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস লাখাই থানা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি।’

যুদ্ধের নয়মাস লাখাইবাসীর কাছে আমি হয়ে গেলাম তাদের প্রিয় আঞ্জু ভাই। আমার কথামত সব চলত। শুরু হয়ে গেল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ। তখন হবিগঞ্জের এসডিও ছিল ওয়াহিদুজ্জামান। তিনি ছিলেন সেক্টর কমান্ডার নুরুজ্জামানের বড় ভাই। আমরা এসডিও ওয়াহিদুজ্জামানের বাসায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প করি। রাতে আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কাজ চালাতে লাগলাম। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমাকে হবিগঞ্জ, লাখাইয়েই থাকতে হয়েছে তবে এর মধ্যে জরুরি কাজে দুইবার ঢাকায় যেতে হয়েছিল।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কিভাবে পরিচয় হল? তার সঙ্গে কোনো স্মৃতি আছে?
উত্তর: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৬৪ সালে। আমার তিন নম্বর ভাই ফিরোজ আহমেদ তখন নির্বাহী প্রকৌশলী। গাজী গোলাম মোস্তফার বড় ভাই এ, এন, গাজী ছিলেন একই বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী। চাকরি সূত্রে এ, এন গাজী সাহেবের মেয়ের বিয়েতে গেলে সেখানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। তাঁকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে তিনি একজন বড় নেতা। আট দশজন বাঙালির মত খুব সাধারণ ছিল তার চলনবলন। কর্মীদের সঙ্গে তিনি যেভাবে মিশতে পারতেন সেটা আর কোনো বাঙালি নেতার পক্ষে সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু খুব সহজে নেতাকর্মীদের মনে দাগ কাটতে পারতেন, নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে পারতেন। তাঁকে আমার অনেক প্রাগ্রসর নেতা মনে হয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি দুর্বল ছিলাম। তাকে মনে-প্রাণে একজন বড় মাপের সমাজতান্ত্রিক নেতা মনে হয়েছে আমার কাছে। তার রাজনৈতিক দর্শন, পরিবেশ- পরিস্থিতি বুঝে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু এমন একজন মানুষ ছিলেন যার কোনো কমতি বা ঘাটতি ছিল না- ঘাটতি ছিল শুধু আপন আর বিশ্বস্ত মানুষের। বঙ্গবন্ধুর প্রতি কিছু ক্ষোভও যে নেই তা নয়- কে তার জন্য কল্যাণের, কে তার জন্য অমঙ্গলের তা তিনি বুঝতে চাইতেন না। তিনি তার কাছাকাছি থাকা কতিপয় মানুষের কান-কথাকে গুরুত্ব দিয়ে কাছের মানুষদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যদি তার প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীদের কথা শুনতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশ আরও অনেক আগেই উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে যেত বলে বিশ্বাস করি। এর মধ্যে জগন্নাথ কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে একেবারে হাত পা ঝাড়া বেকার মানুষ। দেশ স্বাধীনের পর কিছু একটা করতে হবে ভেবে টুকটাক ব্যবসা বানিজ্য করার চেষ্টা করতে থাকলাম।

এদিকে সদ্য স্বাধীন দেশে বিরোধী শক্তি একটার পর একটা ঝামেলা তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থির করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল- এই ষড়যন্ত্রে হাত মেলাল যুদ্ধে পরাজিত দেশি-বিদেশি শক্তি। জাসদের রাজনীতি আওয়ামী লীগের ভাল কাজগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলল। বিরোধীদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর মানবিকতা আর ঔদার্যই ছিল মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। গুপ্তহত্যা, প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে হুংকার- খাদ্য সংকট- সব মিলিয়ে বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে বেকায়দা পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে ঐক্যবদ্ধ হল তখন সত্যি সত্যি অবস্থা বিপদজনক হয়ে উঠল। বঙ্গবন্ধু খুব ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি শামাল দেয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন। শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে জাসদ সহ বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করার কথা বললেও বঙ্গবন্ধু তাতে পাত্তা না দিয়ে বিরোধীদের সময় দিয়েছিলেন শুধরে যেতে- শত্রুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এই সময় দেয়াটাই তার জন্য পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বাকশাল গঠনের পর আমি এই দলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমানের হাত ধেরে ১লা আগস্ট, ১৯৭৫ বাকশালে যোগ দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠন ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফসল।

প্রশ্ন: দেশের জন্য যুদ্ধ করলেন অথচ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নেই- কারণ কী?
উত্তর: প্রথমত আমি ন্যাপের রাজনীতি করতাম। দ্বিতীয়ত আমার কোনো আকাংখা ছিল না। আমি মনে করতাম দেশমাতৃকার জন্য আমার কিছু পবিত্র দায়িত্ব আছে- একাত্তরের যুদ্ধের নয়মাস অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে ড্যাশ স্বাধীন করেছি- এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তাই বঙ্গবন্ধুর আহবানে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি।

যুদ্ধের পর ঢাকায় ফিরে এলাম। জীবন জীবিকার জন্য টুকটাক ব্যবসা বানিজ্যের পাশাপাশি আবার পুরনো রাজনীতি নিয়ে মেতে রইলাম। সদ্য স্বাধীন দেশে চোখে মনে নতুন স্বপ্ন- অনেক কাজ বাকি। আমার স্বাক্ষর নিয়ে হবিগঞ্জের মানুষ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছে। যুদ্ধের সময় আমি ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে বুল্লা বাজারে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিকদের সংগঠিত করে সংগ্রাম কমিটি গঠন করে তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছি।

প্রশ্ন: জীবনের অন্তিম সময় অতিক্রম করছেন আপনি- দেশের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে কি কোনো প্রত্যাশা আছে?
উত্তর: আমার বয়স এখন ৮৭ চলছে। জীবনে অনেক কিছু দেখলাম- অনেক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের রাজসাক্ষী আমি। আমার আর কোনোকিছুর জন্যে আক্ষেপ নেই। সৃষ্টিকর্তা আমার সব ইচ্ছেই পূরণ করেছেন। রাষ্ট্রের কাছে আমার এখন শুধু একটাই চাওয়া তাহল, জীবনে আর যেক’টা দিন বেঁচে থাকব তা যেন একজন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেঁচে থাকতে পারি। এখন এটাই আমার জীবনের শেষ চাওয়া- এই দেশের কাছে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।

প্রশ্ন: আপনি রাজনীতিতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগসহ অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ছিল- আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও আপনাকে ভাল করে চেনেন। তিনি নিজেও জানেন মুক্তিযুদ্ধে আপনার সাহসি ভূমিকা- তাহলে আপনার ললাটে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে কোথায় সমস্যা?
উত্তর: ২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমি ১৪ দলের লিঁয়াজো কমিটির সদস্য ছিলাম। এছাড়া পাকিস্তান আমল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমি এদেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন- সংগ্রামে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলাম।

হবিগঞ্জসহ আশেপাশের জেলার মানুষসহ আমার পরিচিতরা যখন শুনেছে আমার মুক্তিযোদ্ধার কোনো সার্টিফিকেট নেই তখন আমার চেয়ে তারাই বেশি লজ্জা পেয়েছে। জীবন সায়াহ্নের এই সময় এসে আমার ভেতরে একটা দুঃখবোধই কাজ করে তাহল দেশের জন্য জীবন জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করলাম আর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ছাড়া আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে? এর চেয়ে দুঃখের কিছু নেই।

বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হককে আমি নিজে দুইবার ফোন করে এ ব্যাপারে তাকে বিস্তারিত জানিয়েছি। আমার কথা শুনে মোজাম্মেল হক আমাকে বলেছেন, ‘গনি ভাই, আপনি যে মুক্তিযোদ্ধা একথা আবার আমাকে বলে দিতে হবে? হবিগঞ্জ, লাখাইয়ের সব মানুষ আপনাকে এক নামে চেনে- আপনাকে আমরা সবাই চিনি।’

Channel-i-Tv-Live-Motiom

Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিসাক্ষাৎকার
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

প্রবাসী ৪ বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে ওমান পুলিশ

মে ১৬, ২০২৬

লিটনের কাছে সিলেটের সেঞ্চুরি অন্যরকম

মে ১৬, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন

মে ১৬, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বিদায় বলবেন না বরং বলি, আবার দেখা হবে: বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনার

মে ১৬, ২০২৬

এশিয়াজুড়ে সার্কুলার ইকোনমি এগিয়ে নিতে ‘সোসাইটি ফর এশিয়ান সার্কুলার ইনোভেশন নেটওয়ার্ক’

মে ১৬, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey January 2026 Bkash Stickey September 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT