দেশে খাদ্য অপচয় জনপ্রতি ৮২ কেজি

ছবি: সংগৃহীত।
বৈশ্বিক খাদ্য সংকট, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খাদ্য অপচয় রোধকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় হ্রাসের রূপান্তরকারী সম্ভাবনা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে আজ যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি সচেতনতা দিবস। প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়, যার মাথাপিছু পরিমাণ প্রায় ৮২ কেজি। এই অপচয় কেবল খাবার টেবিল বা রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ফসল কাটা, পরিবহন, ত্রুটিপূর্ণ কোল্ড চেইন সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন স্তরেও সিংহভাগ খাদ্য নষ্ট বা ‘খাদ্য ক্ষয়’ হয়। যখন একটি খাদ্য উপাদান নষ্ট হয়, তখন তা উৎপাদনে ব্যবহৃত মূল্যবান পানি, জমি, শ্রম, জ্বালানি ও মূলধনেরও অপচয় ঘটে। একই সঙ্গে ল্যান্ডফিলে পচনশীল এই বর্জ্য থেকে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১২ দশমিক ৩ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে মাথাপিছু খাদ্য অপচয় অর্ধেক কমিয়ে আনার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার, মোবাইল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং আধুনিক কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে উৎপাদিত মোটের ওপর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হয়।
খাদ্য অপচয়ের এই বিশাল পরিমাণকে সংখ্যার হিসাবে নিচে দেওয়া হলো:
- শতকরা হার ও মোট পরিমাণ: বিশ্বজুড়ে চূড়ান্ত ভোক্তা পর্যায়ে (বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ ও খুচরা বিক্রেতা) সরবরাহ করা খাবারের ১৯ শতাংশ বা ১০০ কোটি টনেরও বেশি (১ দশমিক শূণ্য ৫ বিলিয়ন টন) খাবার সরাসরি অপচয় হয়।
- দৈনিক অপচয়: এই বিপুল পরিমাণ অপচয় হিসাব করলে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ১০০ কোটি বেলারও বেশি খাবার (১ বিলিয়নের বেশি মিল) স্রেফ ডাস্টবিনে চলে যায়।
উৎপাদন ও পরিবহন স্তরে ক্ষতি: ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই অর্থাৎ ফসল কাটার পর থেকে বাজারজাতকরণের আগ পর্যন্ত মধ্যবর্তী বিভিন্ন স্তরে আরও ১৩ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়।
অপচয়ের প্রধান উৎসসমূহ
মোট অপচয় হওয়া খাবারের খাতভিত্তিক বিভাজন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় আমাদের নিজেদের অজান্তেই:
- বাসাবাড়ি: মোট খাদ্য অপচয়ের ৬০ শতাংশ ঘটে বাসাবাড়িতে (যা প্রায় ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন)।
- খাদ্য পরিষেবা: রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্যাফেটেরিয়া ও বিয়েবাড়ির মতো জায়গায় নষ্ট হয় ২৮ শতাংশ খাবার।
- খুচরা বিক্রেতা: সুপারশপ, মুদি দোকান বা কাঁচাবাজারে অপচয় হয় বাকি ১২ শতাংশ খাদ্য।
বৈশ্বিক মাথাপিছু গড় ও অর্থনৈতিক প্রভাব
- বিশ্বে একজন মানুষ গড়ে প্রতি বছর ৭৯ কেজি খাবার অপচয় করে।
- এই বিশাল পরিমাণ খাদ্য অপচয়ের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যেখানে বিশ্বের প্রায় ৭৮ কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে ও প্রতিদিন অনাহারে ঘুমাতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই অপর পাশে এই বিপুল পরিমাণ খাবার প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে।






