আল্লাহকে যেভাবে ডাকলে তিনি সাড়া দেন

ছবি: সংগৃহীত।
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন পাশে থাকা মানুষগুলোকেও নিজের কষ্ট বোঝানো কঠিন হয়ে যায়। তখন মনে হয় কেউ যদি মনের কথাগুলো না বলেও বুঝতে পারত! ইসলামের সবচেয়ে সুন্দর আশ্বাসগুলোর একটি হলো, আল্লাহ তার বান্দার ডাক শোনেন। বান্দা তাকে ডাকলে তিনি দূরে থাকেন না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।” —সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬
আরেক আয়াতে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” —সূরা গাফির, ৪০:৬০
তাহলে আল্লাহকে কীভাবে ডাকলে দোয়া কবুলের আশা করা যায়?
বিশ্বাস নিয়ে ডাকতে হবে
দোয়া শুধু কিছু শব্দ উচ্চারণের নাম নয়। এর সঙ্গে থাকতে হয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার সময় দৃঢ়ভাবে চাইতে বলেছেন; ‘হে আল্লাহ, আপনি চাইলে আমাকে দিন’ এভাবে অনিশ্চয়তা প্রকাশ না করতে বলেছেন। —সহিহ মুসলিম, ২৬৭৮
তাই দোয়ার সময় নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে স্পষ্ট করে বলুন। নিজের ভাষায় বললেও সমস্যা নেই। কষ্ট, ভয়, আশা, স্বপ্ন সবকিছু তাঁর কাছে খুলে বলা যায়।
তাড়াহুড়া না করে অপেক্ষা করতে হবে
অনেক সময় মানুষ দোয়া করে দ্রুত ফল না পেলে ভাবতে শুরু করে আল্লাহ হয়তো শুনছেন না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন তাড়াহুড়া থেকে সতর্ক করেছেন।
সহিহ মুসলিমে এসেছে, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে অধৈর্য হয়ে বলে, “আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।” —সহিহ মুসলিম, ২৭৩৫a
অর্থাৎ দোয়ার পাশাপাশি ধৈর্যও জরুরি। কখন, কীভাবে এবং কোন কল্যাণের মাধ্যমে আল্লাহ সাড়া দেবেন তা তার হিকমতের বিষয়।
শুধু বিপদে নয়, সবসময় ডাকতে হবে
দোয়া শুধু বিপদের সময়ের জন্য নয়। সুখের সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করা, তার কাছে চাওয়া এবং কৃতজ্ঞ থাকা মুমিনের জীবনের অংশ।
কোরআনে আল্লাহ নিজেই বান্দাদের তাকে ডাকতে বলেছেন। তাই প্রয়োজন ছোট হোক কিংবা বড়—আল্লাহর কাছে চাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সংকোচ থাকা উচিত নয়। —সূরা গাফির, ৪০:৬০
রাতের শেষভাগে দোয়ার বিশেষ মর্যাদা
রাতের শেষ তৃতীয়াংশ দোয়া ও ইস্তিগফারের জন্য বিশেষ সময় হিসেবে হাদিসে এসেছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এ সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বান করা হয় কে তাকে ডাকবে, যাতে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন; কে চাইবে, যাতে তাকে দেওয়া হয়; কে ক্ষমা চাইবে, যাতে তাকে ক্ষমা করা হয়। —সহিহ মুসলিম, ৭৫৮a
তাই রাতের নির্জন সময়টি দোয়ার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। চারপাশ যখন নীরব, তখন নিজের দুর্বলতা ও প্রয়োজন নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো হৃদয়কে আরও বিনয়ী করে।
দোয়ার সঙ্গে আমলও থাকতে হবে
সূরা আল-বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহর নির্দেশ মানা ও তার প্রতি ঈমান রাখার কথাও এসেছে।
তাই শুধু চাওয়া নয় নিজেকে সংশোধনের চেষ্টাও জরুরি। হারাম থেকে বেঁচে থাকা, ফরজ ইবাদত আদায় করা, মানুষের হক নষ্ট না করা এবং গুনাহ হয়ে গেলে তওবা করা এসবও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার অংশ।
আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় বলুন
দোয়ার জন্য সবসময় কঠিন বা দীর্ঘ শব্দ প্রয়োজন নেই। কখনো একটি ছোট বাক্যও হৃদয়ের গভীর আকুতি হয়ে উঠতে পারে—
“হে আল্লাহ, আমি জানি না আমার জন্য কোনটা ভালো। আপনি জানেন। তাই আমার জন্য যা কল্যাণকর, সেটিই নির্ধারণ করুন এবং আমার অন্তরকে তাতে সন্তুষ্ট করে দিন।”
আবার কখনো শুধু বলা যায়, “হে আল্লাহ, আমাকে সাহায্য করুন।”
কারণ আল্লাহর কাছে বান্দার প্রয়োজনের ভাষার চেয়েও তার অন্তরের অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
দোয়া মানে শুধু চাওয়া নয়
সবশেষে মনে রাখা দরকার, দোয়া করা মানে এই নয় যে আমরা আল্লাহর কাছে কিছু চাইব আর ঠিক আমাদের চাওয়া পদ্ধতিতেই তা ঘটতে হবে। বরং দোয়া হলো বান্দার নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
কখনো উত্তর আসে প্রত্যাশিতভাবে, কখনো সময় লাগে, আবার কখনো আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী ভিন্নভাবে বিষয়টি ঘটে। কিন্তু একজন মুমিনের কাজ হলো দোয়া করা, চেষ্টা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
কারণ কোরআনের সেই আশ্বাসটি সবসময় মনে রাখা যায়—
“আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬
তাই মন ভেঙে গেলে চুপ করে থাকবেন না। মানুষের কাছে সব কথা বলা সম্ভব না হলেও আল্লাহর কাছে সব কথা বলা যায়। আপনার চোখের পানি, আপনার নীরব কষ্ট, আপনার বলা ও না-বলা প্রতিটি কথা সবই তার জ্ঞানের মধ্যে।






