প্রথম রাউন্ডের লড়াই দিয়ে কড়া নাড়তে থাকা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে রোববার। সাতটি বিশ্বকাপ পেরিয়ে এসেছে ২০ ওভারের ক্রিকেটের রোমাঞ্চকর যাত্রা। সাউথ আফ্রিকায় বসেছিল প্রথমটি। পরেরটি ইংল্যান্ডে। ঘটনাবহুল আর উত্তেজনায় ঠাঁসা প্রতিটি আসরের স্মৃতি তুলে আনছে চ্যানেল আই অনলাইন। এপর্বে থাকছে ২০০৯ মহাযজ্ঞের স্মৃতিগাঁথা।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের রাস্তায় সেদিন হুট করেই লেগে গেল বিশাল যানজট। কী অদ্ভুত, ২০০৯ সালের জুনের ২১ তারিখের সেই বিরক্তিকর যানজটে পড়েও লম্বা-চওড়া হাসি দেশটির প্রতিটি মানুষের মুখে! যে যেখানে থেকে পেরেছেন, নেমে পড়েছেন রাস্তায়। মিষ্টির দোকানে চেনা চিত্র বদলে গেছে ততক্ষণে। দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। যে যাকে পারছেন, মিষ্টি খাইয়ে ভাগাভাগি করছেন আনন্দ। হাজারও মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে ‘পাকিস্তান, পাকিস্তান’ ধ্বনি।
প্রশ্ন হল— সেসময় বাড়ন্ত অভ্যন্তরীণ সমস্যা, চড়ে ওঠা জঙ্গিবাদ ও চরম অর্থনৈতিক নাজুক অবস্থার দেশটির মানুষ সেদিন হুট করেই কেন বদলে গেলেন। কী এমন ঘটেছিল, সেদিন দেশটিজুড়ে মানুষ ফেটে পড়েছিলেন বাঁধভাঙা আনন্দ-উল্লাসে? উত্তরটা এমন হওয়াই স্বাভাবিক ছিল— বিশ্বকাপ জিতেছে পাকিস্তান। কিন্তু সেটির বদলে একটু ঘষামাজা করে বলতে হচ্ছে, বিশ্বে নিজেদের অবস্থান ফিরে পেয়েছিল পাকিস্তান। মানে, নতুন জীবন!
আক্ষেপে ভুগতে থাকা জাতির উল্লাসে ফেটে পড়ার পেছনের গল্পটা এমন, যা অনেকখানি লম্বা। দৃঢ়প্রত্যয়ের সেই গল্প শেষপর্যন্ত বিশ্বজয় করে থেমেছে। লর্ডসে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন ইউনুস খান। জানান দিয়েছেন, পাকিস্তান খেলাপ্রিয় ও শান্তিপ্রিয় দেশ! নিজেদের দেশে ক্রিকেট ফিরুক, চাওয়া সেটাই।
২০০৯ সালে পাকিস্তানের বিশ্বজয়ের আখ্যান লিখলে সেটার শিরোনাম ‘আক্ষেপের অবসান’ ছাড়া ভিন্ন কিছু আসবে না। কিন্তু পেছনের কারণ এতটা বড় যে, ক্রিকেটে পাকিস্তান নামটা দেখতে পাওয়াই ছিল শঙ্কার। আগেও বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার স্বাদ পেয়েছিল দেশটি। কিন্তু নাজুক সেই সময়ে ওই শিরোপাটি তাদের বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল। বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জ্বালানি জুগিয়েছিল। দিয়েছিল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম আসরে ভারতের কাছে খুব কাছে যেয়ে হারের ক্ষতে প্রলেপও।
২০০৯ সালে পাকিস্তানে দুটি বড় এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমটি, পাকিস্তান ক্রিকেটের কালো অধ্যায়; শ্রীলঙ্কা দলের টিম বাসের ওপর সন্ত্রাসীদের অস্ত্র হামলা, গুলি বর্ষণ। অন্যটি, টি-টুয়েন্টি শিরোপা জিতে ফেরা। ঘুরে দেখা যাক ইউনুস খানের নেতৃত্বে বিশ্বজয়ের সেই গল্পের আসরটির খুঁটিনাটি।
আঁতুড়ঘরে আসর এবং জিম্বাবুয়ের না থাকা
সাউথ আফ্রিকায় সফলভাবে ২০০৭ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের পর খেলাটির অনেককিছুই বদলে গেছে ততদিনে। কম সময়ের বাণিজ্যিক সাফল্য নির্ভর খেলায় ভালো করেই মজে গেছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। দুবছর পরই তাই আবারও বেজে ওঠে ছোট ফরম্যাটে বিশ্বসেরা খোঁজার দামামা।
তখনকার টেস্ট খেলুড়ে দশ দেশের নয় দল সুযোগ করে নেয় বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার। জিম্বাবুয়ে সাদা পোশাকের ক্রিকেট খেললেও রাজনৈতিক কারণে সেই আসরে অংশ নিতে পারেনি। দেশটির প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ায় খেলা হয়নি প্রসপার উতসেয়া-ভুসি সিবান্দাদের।
বাংলাদেশ-সহ টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর সঙ্গে বাছাইপর্ব পেরিয়ে মেগা আসরে যুক্ত হয় তিন ল্যান্ড— স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। ১২ দলের আসর ভাগ করা হয় চারটি গ্রুপে। প্রতিটি দল খেলেছিল দুটি করে গ্রুপপর্বের ম্যাচ। শীর্ষ দুদল পেয়েছিল সুপার এইটের টিকিট। সেখানে চার দল করে ভাগ হয়ে তারা নেমেছিল সেরা চারে যাওয়ার লড়াইয়ে।
প্রথম বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ইতিহাস গড়া বাংলাদেশকে ফিরতে হয়েছিল শূন্য হাতে। গ্রুপপর্বে ভারত ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দুটিতেই হেরেছিল টাইগাররা। বাংলাদেশের গ্রুপ থেকে সেরা আটে জায়গা নিশ্চিত করেছিল ভারত ও আয়ারল্যান্ড। অন্য তিন গ্রুপ থেকে সেরা হয়ে আসে ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও সাউথ আফ্রিকা। রানার্সআপ হয়ে শেষ আটের জায়গা নিশ্চিত করে নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান।
সুপার এইটের খেলায় মুখ থুবড়ে পড়ে আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত। গ্রুপের সাউথ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের সবার বিপক্ষে হেরে শূন্য হাতে ফেরে প্রথম টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নরা। এই গ্রুপ থেকে সেমিফাইনালের মঞ্চ নিশ্চিত করে প্রোটিয়া ও ক্যারিবীয় দল। অন্য গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ চারে আসে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে উড়তে থাকা সাউথ আফ্রিকার সামনে পড়ে পাকিস্তান। নটিংহ্যামের ট্রেন্ট ব্রিজে শহীদ আফ্রিদির দাপটে প্রোটিয়ারা হেরে যায় ৭ রানে। অন্য সেমিতে, উইন্ডিজকে ধসিয়ে দেয় আসরের অন্যতম ফেভারিট শ্রীলঙ্কা। তিলকারত্নে দিলশানের ৫৭ বলে ৯৬ রানের ইনিংসে লঙ্কানরা ১৫৮ রান তোলার পর অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ধসিয়ে দেন ক্যারিবীয়দের দীর্ঘ ও শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ। প্রথম টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালেও এশিয়ার দুটি দেশ, দুবারই চমক দেখিয়ে শিরোপার মঞ্চে পাকিস্তান।
ফাইনাল-শিরোপা, প্রত্যাবর্তন এবং বব উলমার
প্রথম বিশ্বকাপে পাকিস্তানের শিরোপা খোয়ানোর ক্ষতের পাশাপাশি নিজেদের দেশের বাজে অবস্থা খুব পোড়াচ্ছিল ইউনুস খানের দলকে। যে দলটির বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, তাদের রেটিং দেবে এমন কাউকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০০৭-০৯ সালে দু’বছরে অনেক বড় আক্ষেপ স্ফুলিঙ্গে রূপ নিয়েছিল পাকিস্তানের। এত কাছে তবুও কতদূরে— বলে যে কথাটা আছে সেটা আইসিসির প্রথম টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিল দেশটি।
প্রথম আসরের শিরোপা হাত থেকে ফসকে গেলেও দ্বিতীয় আসরে ঠিকই ট্রফির স্বাদ নেয় ইউনুস খানের দল। ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের পর ইংল্যান্ডের মাটি থেকে টি-টুয়েন্টি শিরোপাও নিয়ে আসে পাকিস্তান। ওই বিশ্বকাপে দারুণ পারফরম্যান্স করেন বুমবুম খ্যাত শহীদ আফ্রিদি। নজরকাড়া বোলিং ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে পাকিস্তান ট্রফি জিতে নেয়।
লর্ডসের ফাইনালে আগে ব্যাটিং করে শ্রীলঙ্কা ৬ উইকেটে ১৩৮ রান করে। নিখুঁত লাইন-লেন্থ ধরে রেখে আব্দুর রাজ্জাক লঙ্কানদের গুটিয়ে দেন। ৩ ওভারে ২০ রানে নেন ৩ উইকেট। আফ্রিদিও একই রান খরচে নেন ১ উইকেট। জবাবে পাকিস্তান ৮ বল আগে লক্ষ্যে পৌঁছায়। কামরান আকমলের ২৮ বলে ৩৭ রানের ঝড়ো শুরু। মাঝে বিপর্যয়ে পড়লেও আফ্রিদির ৪০ বলে ৫৪ রানের হার না মানা ইনিংসে ট্রফি আসে। ম্যাচসেরা হন আফ্রিদি। আসরসেরা ফাইনালে ব্যর্থ হওয়া দিলশান।
৮ উইকেটের বড় জয়ে একরাশ আক্ষেপ আর না পাওয়ার দীর্ঘ নিঃশ্বাস উগরে দিয়ে শিরোপা মাথার উপর উঁচিয়ে ধরেন ইউনুস খান। ২০০৭ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালে মারা যাওয়া পাকিস্তানের কোচ বব উলমারের উদ্দেশ্যে বিশ্বকাপ উৎসর্গ করে পাকিস্তান। প্রাণ ফিরে পাওয়া বিশ্বকাপে পাকিস্তান জিতেও নেয় আসরের অনেকগুলো পুরস্কার, সেরাদের তালিকায়ও থাকে পাকিস্তানিদের আধিক্য। পেসার উমর গুল ৭ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে হন সেরা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ফাইফারও তোলেন গুল।
সেই বছরের মার্চে লঙ্কানদের টিম বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর যেভাবে শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিল পাকিস্তান ক্রিকেটের ভাগ্য-ভবিষ্যৎ, এই বিশ্বকাপ জয় দিয়ে সেই শঙ্কার ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে দেশটি। সেজন্য এটা তাদের পুনর্জীবনের বিশ্বকাপও। যদিও পাকিস্তানে আবারও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরতে একযুগের বেশি লেগে গেছে।







