বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে পত্রিকাটি বলেছে, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটের এই সময়ে প্রতিবেশী কূটনীতি এবং গ্লোবাল সাউথের মধ্যে সহযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন ভিত্তি হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার নেতাদের সাম্প্রতিক চীন সফর উন্নয়নশীল দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা জোরদারের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
নিবন্ধে বলা হয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ক্রমেই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, বহুমুখী উন্নয়ন সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে একটি ‘যুগান্তকারী মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে গ্লোবাল টাইমস বলেছে, এই সফরের দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সফরকালে বাংলাদেশ ও চীন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছেছে। পাশাপাশি উভয় দেশ ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গঠনে সম্মত হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ চীনের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা, উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা ও কৌশলগত সমন্বয় আরও গভীর হয়েছে বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, তিনি চীনের আধুনিকায়নকে বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অর্থনীতি, বাণিজ্য, সংযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নিবন্ধের লেখক জানান, সম্প্রতি চীন সফর করা দুটি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, বাংলাদেশের তরুণ, পেশাজীবী এবং স্থানীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ এখন চীনকে দেশের আধুনিকায়নের নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে দেখছেন। চীনের শিল্পপার্ক, উদ্ভাবন কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিদর্শনের মাধ্যমে তারা দেশটির উন্নয়ন মডেল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পেয়েছেন বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন শুধু অবকাঠামো ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সবুজ উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, আধুনিক শিল্পায়ন এবং জনপ্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো ভবিষ্যতমুখী খাতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গ্লোবাল টাইমসের মতে, বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি অন্য কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের বিকল্পও নয় বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, কিছু পশ্চিমা ও ভারতীয় গণমাধ্যম চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে অযথা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে তুলে ধরছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্লেষণে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, শরণার্থী সংকট এবং স্থানীয় বাস্তবতাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে এসব বাধা মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মত দিয়েছে গ্লোবাল টাইমস।
নিবন্ধের উপসংহারে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নভিত্তিক অংশীদারিত্ব জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ, অর্থনৈতিক একীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে বলেও মন্তব্য করেছে পত্রিকাটি।







