শিল্প সাহিত্য

আসামা পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির খোঁজে

জাপানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির খোঁজে ৫

আসামা পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির খোঁজে

টোকিওর হোটেল থেকে কারুইজাওয়া শহরের দূরত্ব প্রায় ১৬২ কিলোমিটার। স্থানীয় ট্রেন, বুলেট ট্রেন ও ট্যাক্সি মিলিয়ে সেখানে পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। পাহাড়ি এই শহরে পৌঁছানোর পরও আমাদের গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ ছিল না। আসামা পাহাড়ের ওপর অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি উদ্যান যেতে হলে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। চন্দনা আর উঠতে পারেনি। আনি ও আমি উঠতে পেরেছিলাম, তবে পথটা বেশ ক্লান্তিকর ছিল।

পাহাড়ের প্রায় ১২০০ মিটার উচ্চতায় উসুই পাস পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে অবস্থিত এই স্মৃতি উদ্যান। সেখানে রবীন্দ্রনাথের একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য রয়েছে। ১৯৮০ সালে কবির জন্মের ১২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাপান টেগোর সোসাইটি ড. তোমি কোরার সহযোগিতায় ভাস্কর্যটি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। জাপানের প্রখ্যাত ভাস্কর হিরোআতসু তাকাদা (১৯০০-১৯৮৭) এটি নির্মাণ করেন। ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাস্কর্যটি উন্মোচন করা হয়।

আসামা পাহাড়ের এই স্মৃতি উদ্যানের পেছনে রয়েছে এক জাপানি নারীর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ও নিষ্ঠার গল্প। তিনি ড. তোমি কোরা। রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ অনুরাগী, জাপান ও এশিয়ায় শান্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক।

তোমি কোরা ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক

রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য পুরুষ ভক্তের পাশাপাশি নারী অনুরাগীও ছিলেন। তাদের মধ্যে তোমি কোরা ছিলেন ব্যতিক্রমী একজন। ১৯১৬ সালে কবির প্রথম জাপান সফরের সময় তিনি টোকিওর একটি নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তখন তার বয়স ১৯ বছর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ যখন সেখানে অবস্থান করছিলেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কবিকে আসামা পাহাড়ে শিক্ষার্থীদের গ্রীষ্মকালীন শিবিরে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কবি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তোমি কোরা ছিলেন সেই শিবিরের শিক্ষার্থীদের একজন।

পাহাড়ের সেই শিবিরেই প্রথম রবীন্দ্রনাথকে কাছ থেকে দেখেন তোমি। কবি সেখানে নিজের কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। তার আবৃত্তি তোমি কোরার মনে গভীর ছাপ ফেলে। তার কাছে কবির কণ্ঠস্বর মনে হয়েছিল মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির মতো, যা কখনো উঁচুতে ওঠে, কখনো নিচে নামে। তরুণী তোমির মনে কবির সেই আবৃত্তি ও বক্তব্য গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেদিনের পরিচয় থেকেই শুরু হয় তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

তোমি কোরা পরে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি জাপানে মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। অসাধারণ মেধা ও কর্মজীবনের স্বীকৃতিতে তিনি নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন। পাশাপাশি শান্তি আন্দোলনের কর্মী হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেন। জাপানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন দুইবার।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার মোট ছয়বার দেখা হয়েছিল। এর মধ্যে চারবার জাপানে, একবার যুক্তরাষ্ট্রে এবং একবার ভারতে। কবির চিন্তা ও আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু লেখা জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। জাপান টেগোর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭৭ সালে জাপানের মর্যাদাপূর্ণ ‘অর্ডার অব দ্য সেক্রেড ট্রেজার’ সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। নিজের জাপানের বাড়ির নামও রেখেছিলেন ‘শান্তিনিকেতন’।

আসামা পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই তোমি কোরা। জাপান সরকার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং জাপান উইমেনস ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে স্মৃতি উদ্যানটি।

রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্যের ঠিক পেছনের পাথরের দেয়ালে খোদাই করা আছে কবির শান্তির বাণী ‘জিনরুই ফুসেন’, যার অর্থ যুদ্ধহীন মানবজাতি। ভাস্কর্যটির পাশে জাপানের আরও কয়েকজন বিখ্যাত সাহিত্যিকের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। পুরো পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটির নামই দেওয়া হয়েছে ‘সাহিত্য যেখানে বাস করে, সেই স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্যসমূহ’। সেখানে জাপানের বিখ্যাত সাহিত্যিক হিরোশি ইয়োসানোর স্মৃতিস্তম্ভও রয়েছে।

সাকুরা বা চেরি ফুলের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আনি। পাহাড়ের এই নির্জন পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য, তার শান্তির বাণী এবং তোমি কোরার দীর্ঘ সাধনার ইতিহাস মিলিয়ে জায়গাটি অন্য রকম এক অনুভূতি তৈরি করে। এত দূরের একটি দেশে কবির স্মৃতি এভাবে যত্ন করে সংরক্ষিত রয়েছে, তা সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো।

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার স্মৃতি

আসামা পাহাড় থেকে ফিরে আমরা ঘুরে দেখি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৬ সালের ১১ জুন রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন টোকিও ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে (বর্তমান টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়) একটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার বক্তৃতা শোনার জন্য নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই মিলনায়তন পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

‘দ্য মেসেজ অব ইন্ডিয়া টু জাপান’ শিরোনামের সেই বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ জাপানের সাংস্কৃতিক ঐক্য, সৌন্দর্যবোধ, সংযম এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি জাপানকে আগ্রাসী মনোভাব, পাশ্চাত্যধাঁচের যান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মিলনায়তনের সামনে দাঁড়িয়ে আনি। এক শতাব্দীরও বেশি আগে এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সময় বদলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলেছে, কিন্তু সেই বক্তৃতার বিষয় ও বক্তব্যের গুরুত্ব আজও অমলিন।

এর আগে ১৯১৬ সালের ২ জুলাই টোকিওর কেইও বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘দ্য স্পিরিট অব জাপান’ শিরোনামে বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন কবি। জাপান সফরের নানা স্থানে ঘুরতে ঘুরতে বুঝতে পারলাম, এই দেশে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শুধু ভাস্কর্য বা স্মারক ফলকে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়, পাহাড়, সাহিত্য ও মানুষের স্মৃতিতে তিনি আজও জীবন্ত।

বিষয়:জাপানে রবীন্দ্রনাথ মন্দির রবীন্দ্রনাথ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…