রংপুরের পীরগঞ্জের চতরা ইউনিয়নের স্কুল শিক্ষক সুবল চন্দ্র। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের কৃষি জমিতে ধান চাষ করেন। প্রতিবছর ধান কাটার সময় শ্রমিক না পেয়ে ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হতো। কিন্তু গত ২ বছরে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার ফলে আগের মতো ধান কাটা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না তার। তিনি বলেন, ‘কম্বাইন হারভেস্টার আসার আগে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হতো। ধান কাটার সময় লোক পাওয়া যেতো না। বন্যায় অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যেতো। এখন আমন ও বোরো কোনো মৌসুমেই ধান কাটা নিয়ে কোন চিন্তা থাকে না।’
ওই ইউনিয়নের লোকনাথ চন্দ্র বলেন, ‘আমি হারভেস্টর (কম্বাইন হারভেস্টার) দিয়ে ধান কাটি না, তবে ধান কাটার মৌসুমে এলাকায় হারভেস্টর পাওয়া যায়। এ কারণে ধান কাটার শ্রমিক না পাওয়া নিয়ে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয় না।’
শুধু ওই এলাকার সুবল চন্দ্র, লোকনাথ রায়ই নয়, সারাদেশেই কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার ফলে কৃষকদের ‘চিন্তা’ লাঘব হয়েছে। আর প্রতি মৌসুমেই সারাদেশে কম্বাইন হারভেস্টর দিতে ধান কাটার পরিমাণ বাড়ছে।
সদ্য সমাপ্ত আমন মৌসুমে সারাদেশে আবাদের পরিমাণ ৬১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৪ হেক্টর। এর মধ্যে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার পরিমাণ ৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৫৫ দশমিক ৩ হেক্টর, যা মোট আবাদী জমির ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। যন্ত্রটি দিয়ে ধান কাটার ফলে কৃষকদের সাশ্রয় হয়েছে ৭১৪ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার ৮৮৩ টাকা।
হারভেস্টার যন্ত্র দিয়ে ধান কাটার ফলে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯১৮ দশমিক ৯০ টন শস্যের অপচয় কমেছে, যার বাজার মূল্য ৫৩৫ কোটি ৭৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৪ টাকা।
ফলে শুধু মোট আর্থিক সাশ্রয় ১২৫০ কোটি ৬০ লাখ ০৬ হাজার ৪৯৬ দশমিক ৫০ টাকা।
এর আগে গত মৌসুমে অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থ বছরে আমন মৌসুমে সারাদেশে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিলো। এর মধ্যে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটা হয়েছে ৬ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমির ধান, যা মোট আবাদি জমির ১১ দশমিক ২২ শতাংশ। সেসময় কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটায় কৃষকের সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ৫৪৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এছাড়া শস্যের অপচয় রোধ হয়েছে দুই লাখ ১৮ হাজার টন, যার বাজার মূল্য প্রায় ৫৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে রোপা আমন মৌসুমে সারা বাংলাদেশে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারে কৃষকের প্রায় এক হাজার ১১৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)র ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) তারিক মাহমুদুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘এক একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করতে ৮ ঘন্টা করে ১৮ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। সেখানে কম্বাইন হারভেস্টর দিয়ে মাত্র ১ ঘন্টায় এই কাজগুলো করা যায়। এর ফলে ধান সংগ্রহের অপচয় কমে ৮ শতাংশ। ফলে একরে অতিরিক্ত সাড়ে চার মন ধান বেশি পাওয়া যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে শ্রমিকের মাধ্যমে ১ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ে খরচ হয় ১১ হাজার ৮০০ টাকা। কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে ১ একর জমি ফসল কাঁটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ে খরচ হয় মাত্র ৬ হাজার টাকা (সব খরচ মিলিয়ে)। অর্থাৎ কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে প্রতি একর জমিতে লাভ হয় ৫ হাজার ৮০০ টাকা।’
তারিক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের কোনও বিকল্প নেই। এজন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় ১২ ক্যাটাগরির যন্ত্র হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং সমতলে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি বিতরণ করা হচ্ছে।’
স্মার্ট কৃষিযন্ত্রের কারণে কৃষকদের ব্যয় সাশ্রয়ও হয়েছে। সেই সঙ্গে তারা কম সময়ে নিরাপদে তাদের ধান সংগ্রহ করতে পারছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আশা করেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পাশ কাটিয়ে স্মার্ট কৃষির সহায়তায় খুব কম সময়ে ধান সংগ্রহ করে হাওর তথা দেশবাসীর খাদ্য নিরাপত্তার উত্তম বিধান নিশ্চিত করার নিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রী। কিষান-কিষানি ও কৃষি সম্প্রসারণের মিলিত প্রয়াসে উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’
’এ’ ১২ ক্যাটাগরির যন্ত্রগুলো হলো- কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার, রিপার ও রিপার বাইন্ডার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডার বা বেড প্লান্টার, পাওয়ার থ্রেসার, মেইজ শেলার, পাওয়ার স্প্রেয়ার, পাওয়ার উইডার, ড্রায়ার, পটেটো ডিগার ও পটেটো চিপস বানানোর যন্ত্র। ইতোমধ্যে প্রকল্পের আওতায় ভর্তুকি দিয়ে ৭২৫৬টি কম্বাইন হারভেষ্টারসহ মোট ২৫ হাজার ১৬৫টি কৃষি যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। এসব কৃষি যন্ত্র কৃষি ও কৃষকের জীবন বদলে দিচ্ছে, বলেন তারিক মাহমুদ।
কিছু দিন আগেও দেশে আধুনিক কৃষি যন্ত্র সম্পর্কে অনেকের ধারণা ছিল না। বর্তমানে সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে কৃষক। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে দেশে কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা হতো ৪ শতাংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দাড়িয়েছে গড়ে ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। যা আমন মৌসুমে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ ও বোরো মৌসুমে ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
২০২২-২০২৩ অর্থবছর ঘূর্ণিঝড় মোখার ফসল ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় কম্বাইন হারভেসটার সারা বাংলাদেশে গুরুত্বর্পূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঐ সময় কৃষকের খেতে পাকা ধান ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস ও শ্রমিক সংকটের প্রেক্ষিতে সেসময় কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কেটে, মাড়াই ও ঝাড়াই করে কৃষকের ঘরে ধান তুলে দেওয়া হয়।










