হরেক রকমের অনুভূতির একটি হলো মায়া। যা নানাভাবে, নানা কারণে ফিরে ফিরে আসে। আর যখন ফিরে আসে না, তখন তা পড়ে থাকে জঞ্জালের মতোই, মনের আনাচে-কানাচে, হয়তো অগোচরে। উদয়কালে মনে হয়, এটা এতদিন কোথায় ছিল? অনুভূতিটি শাশ্বত। শ্রেণী-গোত্র ভেদে সবারই এ অনুভূতিটি কাজ করে।
‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমায় জঞ্জালের মতো ছড়িয়ে থাকা কিছু মায়ার হদিস পেতে পারেন দর্শক। আবার অনুভূতিটিকেই লাগতে পারে জঞ্জালের মতো। বড় পর্দার সামনে বসে, দৃশ্যে জীবন বর্ণনা দেখতে দেখতে দর্শক পেয়ে যেতে পারেন নিজের অনুভূতিটির অবিকল বা কাছাকাছি অবয়ব। তার ত্বক স্পর্শ করতে হাজির আছে বয়স ও শ্রেণীভেদে বেশ কয়েকটি চরিত্র।
উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, মাস্তান, যৌনকর্মী, সচ্ছল ব্যবসায়ীর মতো চরিত্রগুলোর গল্প বলার মাধ্যমে এগিয়ে গেছে সিনেমাটি। চরিত্রগুলোর জীবন থেকেই দর্শকরা উপলব্ধি করতে পারবেন নিজের ও চরিত্রগুলোর মধ্যকার অনুভূতির যোগাযোগ।
গল্পের নিম্নবর্গের চরিত্র চাঁদু-সোমা দম্পতি। পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় বেড়ে ওঠা একটি পরিবার। এসব সমস্যার কারণে তাঁদের মধ্যে ভালোবাসাটা কমে গেছে, পড়ে আছে মায়া। চাঁদুকে প্রয়োজনমতো পাশে না পেলেও কাজের ফাঁকে বিয়ের প্রথম দিকের স্মৃতি মনে পড়ে যায় সোমার। অন্যদিকে, সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে বেশি টাকা রোজগারের বাসনায় কাজ শুরু করে চাঁদু। প্রতিদিনকার জীবনে কিছু বিরতি পর পর চাঁদু ও সোমার যে রসায়ন ফুটে ওঠে, তা মায়া ছাড়া আর কিছু নয়।
যৌনকর্মীর গল্পটা বেদনাদায়ক, তবে পরিচিত। স্বামী তার স্ত্রীকে বিক্রি করে দিয়ে বাধ্য করেছে যৌনকর্মী হতে। তার জীবন বাস্তবতায় যেমন কোনো মেদ নেই, তেমন তার সংলাপও রুক্ষ। হঠাৎ করে স্বামীর কথা চলে এলে রাগ করে সে, আবার স্বামীর ভালো স্বভাবের কথা বলতে ভোলেন না। ভালোবাসা তার কাছে এসেও দূরে চলে যায়। এভাবেও বলা যায় যে, যৌনকর্মী নিজেই আর ভালোবাসতে চান না। তার সবই মায়ার ছলনা!
সিনেমায় যৌনকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ মাস্তানের। মাস্তান নিয়মিত বিভিন্ন মানুষকে বিপদে ফেলে। কিন্তু ভালোবাসা আর মায়ার মিশ্র অনুভূতির কারণে যৌনকর্মীকে বিপদে ফেলতে পারে না সে।
যৌনকর্মীর মাধ্যমে ব্যবসায়ীর চরিত্রটির সঙ্গে পরিচয় হয় দর্শকের। বিবাহিত জীবনে অসুখি ব্যবসায়ী। ভালোবাসা খুঁজে ফেরেন তিনি। যার কারণে তার কথায় শুধু দীর্ঘশ্বাস আর ছোটবেলার সুখের স্মৃতি।
উচ্চবিত্তের জীবনও একেবারে সহজ না। তাদের জায়গাতেও একটা পরিশ্রম, বিরক্তি, চিন্তা, ভালোবাসা রয়েছে। আছে মায়া। উচ্চবিত্ত ঘরের বৃদ্ধ; তার সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্পর্ক শুধু দায়িত্ব পালন পর্যন্ত। বৃদ্ধও তেমনি, সে এই বয়সে শুধু নিজেকেই ভালোবাসে।
‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমা নিয়মিত ঘটনা দিয়ে সাজানো প্রবাহমান জীবন। কষ্টটা হলো, এ প্রবাহমান জীবনে ভালোবাসা নেই, আছে শুধু মায়া ও তার জঞ্জাল। এখানে বিশেষ কোনো ঘটনা ক্ষণিকের আনন্দ দেয় ঠিকই, কিন্তু মুহূর্ত হয়ে ওঠে না। তাই হয়তো প্রযোজক জসীম আহমেদ এবং পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী সিনেমায় উদযাপনের অনুষঙ্গ রাখেননি বললেই চলে।
সিনেমায় একটি নাম না জানা চরিত্রকে পাওয়া যায়। যাকে দেখা যায় জঞ্জাল সংগ্রহ করতে। বিভিন্ন সময় চরিত্রটি পর্দায় আসে, ময়লা পোশাক তার, একটাই কাজ করে সে, প্লাস্টিকের বোতল কুড়ায়। সে যেন প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে হাজির হয়েছে সিনেমায়, জঞ্জাল পরিষ্কার করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, কিন্তু পরিষ্কার করা শেষ হচ্ছে না।
সিনেমার গল্প তৈরী হয়েছে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের দুটি ছোট গল্প অবলম্বনে। সিনেমাটিও ছোট গল্পের মতোই। শেষ হয়েও যেন শেষ হতে চায় না। আবেদন রেখে যায়।
মায়ার জঞ্জাল পরিচালক: ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী প্রযোজক: জসীম আহমেদ চিত্রনাট্যকার: ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী ও সুগত সিনহা অভিনয়: অপি করিম, ঋত্বিক চক্রবর্তী, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, সোহেল মণ্ডল, শাওলি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।








