টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর একেবারে বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে সুপার আন্ডারডগ সৌদি আরবের কাছে হেরে গেল এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার, আর্জেন্টিনা। এটি রূপকথা ছাড়া আর কী হতে পারে। এটি সত্যি।
আমাদের সবার কাছে নিশ্চিতভাবে অবিশ্বাস্য। মেসি বা তার দলের কেউ, হেড কোচ স্কালোনি বা সাপোর্ট স্টাফ, কেউ এমনটি ভেবেছিল বলে মনে হয় না। আইমার চেহারাটির কথাও মনে পড়ছে। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে আছেন মলিন মুখে। ভাগ্যিস ফুটবলের কিংবদন্তি ম্যারাডোনা আজ নেই। সারা পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেছে এমন ফলাফল দেখে।
তবে ১৯৯০-এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা উদ্বোধনী ম্যাচে ক্যামেরুনের কাছে ১-০ গোলে হেরেও ফাইনাল খেলেছিল। এমন ইতিহাসের কথাই মনে করে টুর্নামেন্টে এগিয়ে যেতে হবে মেসিদের। আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে যে পজেশন ফুটবল খেলছিল, সেটিই তাদের জন্য ঠিক ছিল। কেন তারা সেখান থেকে সরে এসেছে তা আমার বোধগম্য নয় মোটেই। আর ক্রসফিল্ড পাসগুলো একদম মাপমতো চলছিল।
ভিএআর-এর মাধ্যমে আসা পেনাল্টি থেকে স্পট কিকে কুল-হেডেড ফিনিশ করেন মেসি। চমৎকার এবং দৃষ্টিনন্দন, যদিও ভিএআর-এ দেখতে পাওয়া যায় ডিফেন্সিভ ব্লকটি সে পর্যায়ের গুরুতর ছিল না। রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তা-ই মেনে নিতে হবে সবাইকে। আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠ ছিল দুর্দান্ত। রক্ষণভাগও তাই। কিন্তু ছন্দপতন হল অমনোযোগ থেকে। অতি-আস্থা থেকে নয়।
সৌদি আরব একটি কাজই নিয়মিত করে গেছে। তা হল অফসাইড ট্র্যাপ করা, বল ক্লিয়ার করা আর টানা ডিফেন্স করা। অ্যাটাকিং থার্ডের-ও কিছুটা উপরে গিয়ে সৌদি ডিফেন্ডাররা একটা স্ট্রেইট লাইন ক্রিয়েট করে ডিফেন্ড করছিলেন।
আর্জেন্টিনা বারবার তাই অফসাইডের ফাঁদে পড়ছিল। তারপরও তারা এখানে কৌশল ঠিক করেনি। গ্রাউন্ড বলের চেয়ে লব এবং চিপ অনেক কাজে আসতে পারতো অফসাইড ব্রেক করার জন্য।
এক পর্যায়ে দর্শক হিসেবেই হোঁচট খেতে হয় যে আর্জেন্টিনা অফসাইড থেকে কয়টি গোল করেছিল যা বাদ হয়ে যায় ভিএআর’র সিদ্ধান্তে। যেটি বাস্তবতা তা হল, এই বিশ্বকাপে ভিএআর প্রচুর সময় নষ্ট করছে। এবং খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে বেশ সমস্যা হচ্ছে খেলা আবার শুরু হওয়ার পর। এক্সট্রা টাইমের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।
খেলার শেষদিকে সৌদি ডিফেন্ডারের ইনজুরির কারণে প্রায় ১৪ মিনিট অতিরিক্ত সময় বল মাঠে ছিল। সৌদি আরবের গোল দুটো ছিল দৃষ্টিনন্দন এবং আর্জেন্টিনার আস্থায় চরম কষাঘাত। অবাক করার মতো যে, এমি মার্টিনেজের জাম্প-টাইমিং ভুল ছিল দ্বিতীয় গোলটি হজমের সময়। আর স্কালোনির মারাত্মক ভুল ছিল রোমেরো এবং পারেদেসকে মাঠ থেকে তুলে নেয়া।
এটি ঠিক সৌদি আরবের প্রথম গোলটি হয়েছিল রোমেরোর পায়ের ফাঁক গলে। তবে মার্টিনেজের সেকেন্ড বার কাভার সত্যিই দুর্বল ছিল। না হলে ফুল স্ট্রেচেও ফিংগার-টিপ পাবে না বল, তা হয় কী করে। এমি যে ক্লাসের কিপার, তার থেকে এমনটা আশা করিনি। সত্যি কথা বলতে সৌদি আরবের দলটি তেমন কোনো দল ছিল না যাদের হারাতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
এতগুলো কর্নারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এ বিষয়টিও সবার নজরে এসেছে। এই ঐতিহাসিক ম্যাচটিতে তারকা হয়ে থাকলেন সৌদি কিপার মোহাম্মাদ আল ওয়েইস। একের পর এক সেভ করেছেন তিনি। বুক চিতিয়ে লড়েছেন ম্যাচের শেষ সেকেন্ড অবধি। খেলায় ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও দুই গোল দিয়ে সৌদি আরবের এই জয় দীর্ঘদিন ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় উঠবেই।
আর্জেন্টিনার পরের খেলা মেক্সিকোর সাথে, আর সৌদি আরবের পোল্যান্ডের সাথে। এর ভেতর স্কালোনি নিশ্চয়ই কৌশল বের করবেন তার দলের সবার পুরোটা এবং সর্বোচ্চটা বের করে আনতে। আমাদের সবার বিশ্বাস, তিনি পারবেন। মেসিও পারবেন।
সৌদি আরবের জন্য এরচেয়ে আনন্দের দিন আর হতে পারে না। গোটা বিশ্বের শুভেচ্ছায় এখন সিক্ত হচ্ছেন তারা। বিশ্বকাপে তারাই বা কতদূর এগুতে পারে, সেটিও দেখার প্রতীক্ষায় রইলাম।







