অবশেষে পর্দা নামতে চলেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের। ১০৩ ম্যাচ শেষে রাতে মহাযজ্ঞের ফাইনালে নামছে স্পেন এবং আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেরা নামছে বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে, লা রোজাদের হাতে সুযোগ ১৬ বছর আগের গৌরব ফিরে পাওয়ার। লড়াইটা হবে দুই স্প্যানিশ ভাষীদের মধ্য। মেসির ‘ওয়ান লাস্ট ডান্স’ সাফল্য বা ইয়ামালদের ‘নবজাগরণ’ ঘটবে।
নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় একবারের বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের বিপক্ষে নামবে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। যার পরিচালিত ম্যাচে কখনও জেতেনি আর্জেন্টিনা। ভিনচিচের কেবল একবারই আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনার রেকর্ড সুখকর নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ২-১ গোলে হেরেছিল লিওনেল মেসির দল।
ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে আসেন দুই দেশের কোচ এবং খেলোয়াড়রা। নিজের খেলোয়াড়দের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন স্কালোনি, ‘এতবছর ধরে এই পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সহজ নয়। তারা এমন কিছু অর্জন করেছে, যা একসময় কল্পনারও বাইরে ছিল। আমি তাদের বলেছি, তারা অবিশ্বাস্য এক কীর্তি গড়েছে এবং এজন্য আমি চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকব।’
‘আমি ও আমার পুরো কোচিং স্টাফ এই দলের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। আমরা অবশ্যই শিরোপা জিততে চাই। তবে যদি তা না-ও হয়, এই যাত্রা অবিশ্বাস্য ছিল এবং সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। আশা করি, এটি আমাদের মানুষ ও দেশের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
স্পেন কোচ ফাইনালকে দারুণ এক লড়াই আখ্যা দিয়েছেন। দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ‘দুদলই নিজেদের ফুটবল খেলতে চাইবে এবং রেফারি ম্যাচকে বিশ্বকাপ ফাইনালের মান অনুযায়ী পরিচালনা করবেন।’
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা কোচ স্পেন কোচের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘মাঠে সেই সম্পর্কের কোন প্রভাব থাকবে না।’
ম্যাচের আগে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বলেছেন, ‘এই সমস্ত বছরগুলোর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি কেবল শিরোপা নিয়ে ছিল না, বরং ছিল পুরো যাত্রাটা। ফাইনালে যা-ই ঘটুক না কেন, এই দল ইতিমধ্যেই একটি ইতিহাস গড়েছে, যা ভোলার নয়। ভামোস আর্জেন্টিনা।’
স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির মতে মেসি বিশ্বসেরা। ম্যাচের আগেরদিন রদ্রি বলেছেন, ‘আমার কাছে মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার। তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি নিজের নেতৃত্বে আর্জেন্টিনাকে কাতারে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন, এবারও দলকে ফাইনালে তুলেছেন।’
তবে মেসিকে আটকে রাখাই একমাত্র লক্ষ্য নয়, জানান ম্যানচেস্টার সিটির এ মিডফিল্ডার। রদ্রির ভাষায়, ‘আর্জেন্টিনা মেসির চেয়ে অনেক বড় একটি দল। তাদের দলে অনেক উচ্চমানের খেলোয়াড় রয়েছে। আমার মতে, বর্তমানে স্পেন ও আর্জেন্টিনাই সবচেয়ে ভালো দলগত ফুটবল খেলছে। তাই শুধু মেসি নয়, তাদের অন্য খেলোয়াড়দের দিকেও সমান নজর রাখতে হবে।’
অন্যদিকে স্পেন ডিফেন্ডার আইমেরিক লাপোর্তে অভিযোগ করেছেন, আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের উপর শারীরিক চাপ ও উসকানিমূলক কৌশল প্রয়োগ করে, যা ফুটবলে গ্রহণযোগ্য নয়। বলেছেন, ‘ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখা রেফারির দায়িত্ব। একজন-দুজন খেলোয়াড়কে এমন আচরণের সুযোগ দিলে ম্যাচ বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। ফুটবলের নিয়মের মধ্যে শারীরিক লড়াইয়ে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে এমন কিছু ঘটনা দেখেছি, যা অবাক করেছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের গায়ে ‘দাগ’ রেখে যেতে পছন্দ করে। এমন আচরণ ফুটবলে, বিশেষ করে বড় টুর্নামেন্টে, চলতে দেয়া উচিত নয়।’
মাঠের লড়াইয়ের আগে দুদলের পরিসংখ্যানও সমানে সমানে। দীর্ঘ সাত দশকের ইতিহাসে এ দুদলের লড়াইয়ে কোন পক্ষই একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এপর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে তারা। এরমধ্যে ৬টি করে ম্যাচ জিতেছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন, বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
দুদলের প্রথম সাক্ষাত হয় ১৯৫২ সালের ৭ ডিসেম্বর। স্পেনের মাটিতে হওয়া প্রীতি ম্যাচে স্বাগতিকদের ১-০ গোলে হারিয়ে যাত্রা শুরু করে আর্জেন্টিনা। এরপর বুয়েন্স আয়ার্সে হওয়া ফিরতি ম্যাচেও একই ব্যবধানে জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। শুরুর দিকের আরেকটি দেখাতেও জয় ছিল আর্জেন্টিনার ঝুলিতে। দুদলের সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচে লিওনেল মেসিবিহীন আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে স্পেন। সেই ম্যাচে স্পেনের হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ইসকো।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুদলের দেখা হয়েছে মাত্র একবার। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে বার্মিংহামের ভিলা পার্কে অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্পেনকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের বিপক্ষে শতভাগ জয়ের রেকর্ড এখনও ধরে রেখেছে আলবিসেলেস্তেরা।
ফাইনালের জন্য, ৪-৪-২ ফরমেশনে স্কালোনির পছন্দের একাদশে গোলরক্ষক হিসেবে থাকবেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। রক্ষণভাগে থাকতে পারেন নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। সেমিফাইনালে মাঝ মাঠে জুলিয়ানো সিমিওনে থাকলেও ফাইনালে থাকতে পারেন রদ্রিগো ডি পল, সঙ্গে থাকবেন এনজো ফের্নান্দেজ, লিয়েন্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। আক্রমণভাগে আর্জেন্টিনার রয়েছে বিশ্বসেরা লিওনেল মেসি, যাকে সঙ্গ দেবেন জুলিয়ান আলভারেজ।
ফাইনালে লুইস দে লা ফুয়েন্তের ফর্মেশন হতে পারে ৪-২-৩-১। ফুয়েন্তের গোলবাড়ে প্রথম পছন্দ উনাই সিমন। রক্ষণ সামলাতে থাকবেন আইমেরিক লাপোর্তে, পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি এবং মার্ক কুকুরেয়া। মাঝ মাঠে আছেন রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ। আক্রমণ ভাগে আছেন লামিন ইয়ামাল, দানি ওলমো, অ্যালেক্স বেনা, মিকেল ওয়ারজাবাল।









