ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই ‘দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’। ফুটবল ঘিরে মাতামাতি শুরু হয় এই বিশ্বকাপের আসরেই। কয়েক ঘন্টা বাদেই বিশ্বকাপের চূড়ান্ত আসর। দেশ-কাল-স্থান-ভেদে ফুটবল ঘিরে প্রাণের আবেগে আন্দোলিত হচ্ছে বিশ্বের আনাচ-কানাচ।
কোটি ডলার প্রশ্ন বিশ্বকাপ ২০২৬’র ফাইনাল আসরে কে জিতবে? শিরোপা উঠবে কার ঘরে–আন্দাজ করা যায়? আর আট’শ কোটির জনসংখ্যার কত শত কোটি কোটি মানুষ দেখবে এবারের আসর? সে বিষয়ে কোন ধারণা আছে?
প্রথমেই জানিয়ে রাখি সেই ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের যে বৈশ্বিক আসর আজ অবদি তা চলছে নিরন্তর। মাঝখানে দুটি বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ এ বিশ্বকাপের দুটি আসর ভেস্তে যায়। আজ অবদি চলছে ফুটবল ঘিরে মানুষের আবেগ-উজ্জীবীত উন্মাদনা পর্যায়ের হইহল্লা। আসুন জানি কোন দল কতবার ফুটবলের বৈশ্বিক মঞ্চে ফাইনাল ম্যাচ জিতেছে এবং কোন দেশ, কোন দল ফাইনালের শিরোপা নিজেদের ঘরে তুলেছে? এবারের ফুটবলের ফাইনালে আসরের বৈশ্বিক দর্শকই বা কত? আসুন সেই বিশ্লেষণ করি।
এখনো পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপের শিরোপা ঘুরে তুলেছে বিশ্বের আটটি দেশ। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ ফুটবলের জাদুুকর বা ফুটবলের রাজা পেলের দেশ ‘সেলেসাওরা’ খ্যাাত ব্রাজিলই তুলেছে সবোর্চ্চ ৫বার। পর্তুগিজ ভাষায় ব্রাজিলের পূর্ণ নাম ‘সেলেসাও ব্রাজিয়েইরা’ বা ‘ব্রাজিলের বাছাইকৃত জাতীয় ফুটবল দল’। পঞ্চম ও ৬ষ্ঠ পরপর দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘সেলেসাও’ বা ‘ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল’। মাঝের সপ্তম আসরে বাদে পরের অস্টম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘ব্রাজিল’। এভাবে ধারাবাহিক ভাবে ১৪ ও ১৫ তম বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে যথাক্রমে ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয় ব্রাজিল। যদি বিশ্বকাপের ২২তম এবারের আসরে সেই ‘সেলেসাও বা ব্রাজিলের নির্বাচিত বা জাতীয় দল ছিটকে গেছে শেষ ষোল বা দ্বিতীয় রাউন্ডের নক আউট পর্বেই। ৫ জুলাই, নরওয়ের কাছে ২-১ হোলে হেরে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিদায় নেয় এইবারের টুর্ণামেন্ট থেকেই।
এরপরই রয়েছে ইতালীর অবস্থান। ইতালি শিরোপা জিতেছে চার বার। পর পর দুইবার মানে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ দুই বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইতালী। এরপর দীর্ঘ দিনের গ্যাপে তৃতীয়বার এগারো তম আসরে ১০৮২ সালে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে ইতালী। সর্বশেষ চতুর্থবার ২০০৬ সালে ১৭ তম আসরে চাম্পিয়নের গৌরব রয়েছে ইতালীর।
জার্মানীও চারবার শিরোপা বিজয়ী দল। জার্মানীর প্রথমবার শিরোপা জয় করে সেই ১৯৫৪ সালে বিশ্বকাপের চতুর্থ আসরে। পরে মাঝখানে বিশ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপের নবম আসরে ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছিল জার্মানী। পর্যায়ক্রমে বিশ্বকাপের ১৩তম আসরে ১৯৯০ সালে তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানী। সর্বশেষ চতুর্থবারের মত জার্মানী শিরোপা জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় বিশ্বকাপের ১৯তম আসরে ২০১৪ সালে।
২২তম বিশ্বকাপের এবারের আসরে হট ফেবারিট আর্জেন্টিনা তিনবার শিরোপা জিতেছে। বিশ্বকাপের দশম আসরে ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মত শিরোপা জেতার গৌরব পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। দুই বছরের মধ্যে আবারো চ্যাম্পিয়নের শিরোপা জয়–১২তম আসরে ১৯৮৬ সালে। সেবার দ্বিতীয় দফায় ফুটবলের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তোলে এবারের সেরা দল আর্জেন্টিনা। তৃতীয় শিরোপা পেয়েছে বিশ্বকাপের ২১তম আসরে ২০২২ সালে। সেদিক দিয়ে পর পর দুই টানা শিরোপা ঘরে তোলার জন্য যে ফর্ম ও উদ্দীপনা দরকার এর সবই রয়েছে আর্জেন্টিনার। দলটির ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখতে যেন শিরোপা ঘরে তুলতে একেবারে টগবগ করে ফুটছে দল আর্জেন্টিনা।
উরুগুয়ে ও ফ্রান্স ২ বার করে ঘরে তুলেছে বিশ্বকাপের শিরোপা মুকুট। বিশ্বকাপের সূচনার বছর ১৯৩০ সালেই বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়নের গৌরব রয়েছে ‘উরুগুয়ের’। সেবার প্রথম আসরেই জানান দিয়েছিল আজকের হট ফেভারিট আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফুটবলের ছন্দে অনবদ্য ল্যাটিন আমেরিকার দেশটির ফুটবল ক্যারিশমা। উরুগুয়ে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৯৫০ সালে।
ফ্রান্সও দুই দুইবার ঘরে তুলেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা। ফ্রান্স প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বিশ্বকাপের ১৫তম আসরে ১৯৯৮ সালে, ব্রাজিলকে হারিয়ে। দ্বিতীয়বার ২০ তম আসরে ২০১৮ সালে ক্রোরেশিয়াকে হারিরে।
এবারের আসরে আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের লড়াই জমবে নিঃসন্দেহে। কেননা তিন বারের বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনার সাথে লড়বে একবার বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলা ‘স্পেন’। ‘স্পেন’ বিশ্বকাপের ১৮তম আসরে ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে। ২০২৬ এর আসরে সঙ্গতকারণের দারুণ উজ্জীবিত আরেক হট ফেবারিট ‘স্পেন’ মুখিয়ে থাকবে দ্বিতীয়বারের মত শিরোপা ঘরে তোলার লড়াইতে। তাদের মানসিক চাঙ্গা রাখছে অবশ্যই ১৬ বছর আগের প্রথমবারের শিরোপা বিজয়ের আনন্দ-উদ্দীপনা।
সময় যত গড়িয়েছে ফুটবলের প্রতি বেড়েছে ভালোবাসা আবেগ এবং কমিটমেন্টও। তাই সময়ের সাথে ফুটবল ভক্তের সংখ্যা বেড়েছে। যদিও এবারের আসর ‘হাজার মাইল দূরের কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকো দুই মহাদেশের তিন দেশ জুড়ে। তারপরও এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে আবেগ সব দূরুত্বই যেন বাধা মানেনি। সাদা, কালো, বাদামি বর্ণের মানুষের ভীড়ে ৮’শ কোটির জনবহুল বিশ্বর কোনায় কোনায় ছড়িয়েছে এবারের আসরের উন্মাদনা। সেই মাত্রাছাড়া আবেগ যেন উসকে দিয়েছে স্যাটেলাইটের কল্যাণে প্রযুক্তির যোগসূত্রতায়। টেলিভিশনের কল্যানে এবারের আসরে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষ দেখবে ‘বৈশ্বিক ফুটবলের’ টসবগে টানটান উত্তেজনা। মাঠ মাতানো দূরন্ত ছন্দ।
ফুটবলের সাথে বাণিজ্যিক যোগসূত্রতা অঙ্গাঅঙ্গি ভাবেই জড়িত। সঙ্গত কারণেই যেন ফুটবল আর বিজ্ঞাপন বিপননের জৌলুস মিলেমিশে একাকার। টেলিভিশন সত্ত কিনে বিশ্বের কানায়-কোনায় ফুটবল ছন্দের আবেগ-উন্মাদনা আজ এমন এক মাত্রাছাড়া আবেগে–ফুটবল আজ আনন্দের নাম, জৌলুসের নাম। বিপনন-বিকিকিনির অর্থনীতি ছাপিয়ে হৃদয়ের জৌলুস ফুটবল ঘিরে।
এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল আসরের অডিয়েন্স কত জানেন কি? শুনলে অক্কা পেতেই পারেন। মাথায় দিতে পারেন হাতও। ‘ফোরজা ফুটবল’ এর বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, এবারের আসরের ফাইনাল খেলা দেখবে ‘এক শত আশি কোটির’ বেশি মানুষ। বিশ্বের প্রায় আট’শ কোটি জনগনের ২১শতাংশই দেখবে এবারের আসর। প্রতি পাঁচ জনের একজন ফুটবল ফাইনালের দর্শক—ভাবা যায়?
বৈশ্বিক আর কোন ইস্যুতে মানুষের এমন আবেগঘন একাত্মতা দেখা যায় নি। একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে ‘ফুটবল বিশ্বকাপের সাথে জনমানুষের দেশ-কাল স্থান অঞ্চল সাদা কালো বাদামি সব ভেদাভেদ ভুলে জনমানুষেরা আবেগের সাথে একাত্ম নতুন বার্তা দেয় বটে। এর আগে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের ২১তম আসরে টেলিভিশনের অডিয়েন্স ছিল একশত ৫০কোটি। ৩০ কোটির বেশি অডিয়েন্স এবারের আসরে যুক্ত হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সহজলভ্য হয়েছে টেলিভিশন বা দূরদর্শনের মাধ্যম- ‘ফেসবুক’ ‘ইউটিউব’ ‘অনলাইন’ বা ‘ভার্চুয়াল’ মাধ্যমও। তথাপিও পাঁচ তারকা হোটেল, রেস্তোরাঁ খোলা মাঠে বিশাল প্রজক্টরে এবারের আসর যেন মাত্রাছাড়া আবেগের বর্হিপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। তবে ফুটবল আবেগ-আনন্দের যে রসদ হয়ে উঠে তা এখনো পর্যন্ত এযাবতকালের রের্কড। এর আগে টেলিভিশন সেটের সামনে হুমড়ি খেয়ে পরার রের্কড আছে ঐতিহাসিক রাজকীয় বৃটিশ রাজবধু ডায়েনার বিয়ে ঘিরে। যদিও সরাসরি টেলিভিশনে হৃদয়ের রাণী হয়ে উঠা ডায়ানার বিয়ে সরাসরি সম্প্রচারের দেখেছিল বিশ্বের প্রায় ৭৫কোটি মানুষ। তখন তো আজকের মত টেলিভিশন, অনলাইন, প্রজেক্টরের এতটা সহজলভ্যতা ছিল না। সেদিক থেকে ২০২৬’র বিশ্বকাপ আসরে ফিফার শ্লোগান- ‘উই আর ২৬’র শ্লোগান আক্ষরিক অর্থেই সঙ্গতীপূর্ন।
গ্যালারিতে বসে সরাসরি খেলা দেখা বাদে টেলিভিশন সেটের সামনে এবারের ফাইনাল আসর দেখবে সাতটি মহাদেশের একশ’ আশি কোটির বেশি মানুষ। বিশ্বের আর কোন আসর ঘিরে এত মানুষের চোখ, দর্শক-অডিয়েন্সের নজির আর আছে কি? পারলে আপনারা সন্ধান করুন।







