শেষ ষোলোতে এসে আটকে গেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নরওয়ের সাথে হেরে বিদায় নিতে হল বিশ্বকাপের লড়াই থেকে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্ত শোকাহত, বিষণ্ণ, বিধ্বস্ত। আজকের (৬ জুলাই) ভোর এতোটা নিষ্ঠুর হবে তা যেন অনেকের কল্পনাতেই ছিল না। কিন্তু ফুটবল তো গোলের খেলা। নেইমারের কান্নায় সিক্ত ভোর আবার কবে আলোকিত হবে তা সময় বলে দেবে। তবে ব্রাজিল ভক্তদের এই পরাজয়ের ক্ষত সইতে হবে অনেক অনেকদিন। খেলার ১৪ মিনিটের পেনাল্টির কথা ব্রাজিল ভক্তরা কখনই ভুলবেন বলে মনে হয় না।
নরওয়ের সাথে ২-১ গোলে ব্রাজিলের পরাজয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন এসেছে সামনে। কেউ যেমন বলছে কেবলই ভুলের কারণে হরেছে ব্রাজিল, কেউ কেউ আবার বলছে ব্রাজিল হেরেছে নরওয়ের দলগত ও পরিকল্পিত ফুটবলের কাছে। আর আর্লিং হালান্ডের নিখুঁত ও চৌকস খেলা ব্রাজিলের পরাজয়কে বড় বেশি ত্বরান্বিত করেছে। কেননা ব্রাজিলের কেউ আর্লিং হালান্ডকে আটকানোর সামর্থ্য দেখাতে পারেনি। ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন পেনাল্টি মিস, রক্ষণে ভুল, প্রাপ্ত সুযোগ নষ্ট, মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, এসবের কারণেই হেরেছে। বিশেষ করে ১৪ মিনিটের সময় প্রাপ্ত পেনাল্টি মিস ব্রাজিলের কপালে পেরেক বিদ্ধ করেছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার বিশ্লেষণ। ১৪ মিনিটে প্রাপ্ত পেনাল্টি শট নেন ব্রাজিলের ব্রুনো গুইমারায়েস। কিন্ত তার স্পটকিক ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলকিপার। অনেকের মতেই দুঃখলিপির লিখন শুরু হয় এখান থেকেই। প্রশ্ন উঠেছে ভিনিসিয়াস এর বদলে কেন ব্রুনোকে দিয়ে পেনাল্টি কিক নেওয়া হল। এই পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারলে ব্রাজিলই জয়ী হতো।
ঠিক এমনটিই মনে করছেন সাবেক তারকা ফুটবলার গোলাম গাউসও। ঢাকার মাঠের পরিশ্রমী স্ট্রাইকার হিসেকে খ্যাত গাউস বললেন, ‘শেষ ষোলোতে এসে এমন মেজাজের ম্যাচে একটি পেনাল্টি মিস করা মানে দলের জন্য দুঃসময় ডেকে আনা। ব্রাজিলের ব্রুনো সেটাই করেছেন। ম্যাচ কেবল জমে উঠছে। ঠিক সেই সময়ে পেনাল্টি মারার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। এই গোলটি হলে হয়ত ব্রাজিলের খেলার চেহারা চরিত্র অন্যরকম হয়ে যেতে। নরওয়ের জন্য ম্যাচটা বের করাও কঠিন হয়ে পড়তো। কিন্তু সৌভাগ্য নরওয়ের কাছে ধরা দেয়। আর দুর্ভাগ্য ব্রাজিলকে গ্রাস করে।’
গাউস আরও বললেন, ‘ব্রাজিল প্রাপ্ত সুযোগ কাজে না লাগানোর খেসারত দিয়েছে। প্রথমার্ধে আরও অনেকগুলো চান্স তৈরি করেছিল। কিন্ত সেখানেও ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড়রা ব্যর্থ হন। সেই তুলনায় নরওয়ে ছিল সংঘবদ্ধ, পরিকল্পিত ও অধিক কার্যকরী। ফলে ব্রাজিলকে পরাজিত হতে হয়েছে। এটাই ফুটবলের রীতি, এটাই ফুটবল।’
গোলাম গাউস নব্বই দশকে ঢাকার মাঠের জনপ্রিয় ফুটবলার। দীর্ঘদিন ধরে আবাহনী ক্লাব লি. এর হয়ে খেলেছেন। আবাহনীর ঘরের ছেলে হিসেবে খ্যাত ছিলেন। ক্লাবের বাইরে একযুগ ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। কলকাতা লিগেও তিনি খেলেছেন। ২০০০ সালে ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেন। এখন নিজস্ব ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে হার্টের সমস্যায় পড়েছিলেন। হার্টে রিং স্থাপন করিয়েছেন। শারীরিক জটিলতা থাকার পরেও বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো মিস করছেন না গোলাম গাউস।
ব্রাজিল বিদায় নেওয়াতে বিশ্বকাপের আমেজ কমে গেল কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘ বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপই। শেষ দিকে কাউকে না কাউকে বিদায় নিতেই হবে। স্বপ্নময় ব্রাজিল একটু আগেই চলে গেল। এখন দেখতে হবে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেনের কী অবস্থা হয়। এখন কিন্তু যেতেই হবে।’
প্রাথমিক হিসেব নিকেশে ফ্রান্স, স্পেন, আর্জেন্টিনাকে বেশি সামনে এগিয়ে রাখছেন গাউস। তবে আর্জেন্টিনার ওপর তার ভরসা কম। তার মতে, আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকলেও তাদের দলগত খেলা খুব উচ্চমানের নয়। দলগত পারফরম্যান্স দেখা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পুরো দলটা মেসির ওপর ভর করেই উঠে এসেছে।
গাউস বললেন, ‘মেসি একটা আলাদা সত্তা ও শক্তি হিসেবে খেলছে। একটা দলকে সে একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মেসির এই স্বাভাবিকতা ক্ষুণ্ণ হলে আর্জেন্টিনা বড় বিপদে পড়তে পারে। আর্জেন্টিনার অন্যান্যরা খুব একটা দৃষ্টিনন্দন খেলা খেলতে পারছে না। গত বিশ্বকাপে ফার্নান্দেজ, ম্যাক আলিস্টার, জুলিয়ান আলভারেজ খুব দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু এবার তেমনটি নেই। শুধু মেসি একশতে একশ।’
সবশেষে গাউস বলেলন, ‘এই সময়ে কারো হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সামনে কোয়ার্টার ফাইনালে আরও বড় ঘটনা ঘটবে। অনেকের প্রিয় দল হয়তো থাকবে না। কিন্তু আমরা সবাই অপেক্ষা করছি ভালো খেলা, ভালো লড়াইয়ের জন্য। সেই লড়াইটা আরও জমবে বলে মনে করি। লড়াই না জমলে, নতুন নতুন ঘটনা না ঘটলে বিশ্বকাপের মজা থাকে না। সীমাহীন উত্তেজনা অসীম আনন্দ আর দুঃখ নদী -এটাই বিশ্বকাপ।’







