বিনোদন

পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয়, শেষ বয়সে চিকিৎসার জন্য আকুতি

পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয়, শেষ বয়সে চিকিৎসার জন্য আকুতি

চলচ্চিত্রের পর্দায় কখনও ছোট চরিত্রে, কখনও পর্দার আড়ালে থেকে অসংখ্য সিনেমা, নাটক ও বিজ্ঞাপন নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন মিজানুর রহমান মিজান। ৬৫ বছরের জীবনে ৪০ বছর ধরে পাঁচ শতাধিক সিনেমায় ক্যারেক্টার আর্টিস্ট হিসেবে অভিনয় করেছেন তিনি। প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবেও ছিল তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘এফডিসির মিজান’ কিংবা মিডিয়ার যেকোনো সমস্যার সমাধানদাতা হিসেবে।

কয়েক বছর আগে হিজড়া সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘আমরাও মানুষ’ নামে একটি সিনেমাও প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। অথচ জীবন সায়াহ্নে এসে সেই মিজানুর রহমান মিজানই এখন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির বিআরটিএ অফিস সংলগ্ন এলাকার বাসায় দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী তিনি।

পরিবারের দাবি, অর্থাভাবে তার চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বাবার চিকিৎসার জন্য সরকারের পাশাপাশি চলচ্চিত্র অঙ্গনের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতা চেয়েছেন তার ছেলে মেহরাজ হোসেন মিরাজ।

মঙ্গলবার দুপুরে চ্যানেল আই অনলাইনকে মিজানের অসুস্থতার কথা জানান তার ছেলে। মিরাজ জানান, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তার বাবা চারবার স্ট্রোক করেছেন। এর মধ্যে একবার হয়েছিল ব্রেন স্ট্রোক। বর্তমানে বাবার শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন যে গত ছয় মাস ধরে তিনি কথা বলতে পারছেন না।

মিরাজ বলেন, দুই বছর ধরে বিছানায় দিন কাটছে আব্বার। নয় মাস ধরে একেবারেই উঠতে পারছে না। বিগত ছয় মাস ধরে কথা বলতে পারে না। গত পাঁচ মাস ধরে নাকে নল দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। এই নলটিও ২১ দিন পরপর পরিবর্তন করতে হয়। তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে করতে আমরা একপ্রকার নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে মিরাজ জানান, তার বাবার ব্রেন হেমারেজ হয়েছে। চিকিৎসার পেছনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সামনে অস্ত্রোপচারের জন্য আরও ১০ লাখ টাকার বেশি প্রয়োজন।

বাবার অসুস্থতার পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন মেহরাজ। তার অভিযোগ, চলচ্চিত্র অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে তার বাবা অনেকের কাছে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘আমরাও মানুষ’ সিনেমাটি নির্মাণ করলেও শেষ পর্যন্ত সেটি মুক্তি দিতে পারেননি। এসব বিষয় নিয়ে তার বাবা দীর্ঘদিন দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে জানান তিনি।

মিরাজের কথায়, ‘আব্বা সারাজীবন ফিল্ম মিডিয়ার পেছনে দিয়েছেন। আজ আমরা এত তারকা দেখি, তাদের সৃষ্টির পেছনে আব্বার মতো মানুষদের অবদান অনেক। কিন্তু তারা জীবনে কোনো অ্যাওয়ার্ড বা সম্মানী পাননি। এমনকি আলোচনাতেও আসেননি। প্রাপ্তির কথা চিন্তা না করে সারাজীবন ভালোবেসে এই পেশাকে আঁকড়ে ছিলেন আব্বা।’

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্য মিজানের চিকিৎসায় সমিতি ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিয়েও কথা বলেছেন তার ছেলে। মিরাজের অভিযোগ, শিল্পী সমিতির নির্বাচনের আগে অভিনেতা জয় চৌধুরী কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আরও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সহায়তা পাননি তারা।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরী। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক দফায় সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তার নিজের পাশাপাশি জায়েদ খান, সনি রহমান, পুষ্পিতা পপি এবং সমিতির পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জয় চৌধুরী বলেন, সমিতি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তারপরও আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি। হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাঁর ছেলে মিরাজ জানিয়েছেন, বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার মতো অবস্থায় নেই। আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি। যে অভিযোগ করা হচ্ছে, এগুলো ঠিক নয়। মিজান ভাই সুস্থ হয়ে উঠুন, এটাই আমার চাওয়া।

অন্যদিকে, বাবার চিকিৎসায় সরকারি সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন মেহরাজ। তার মতে, দেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির বিকাশে পর্দার সামনে থাকা তারকাদের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে কাজ করা মানুষদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শ্রম ও অবদান যেন অবহেলিত না থাকে, সেই প্রত্যাশা থেকেই সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

একসময় চলচ্চিত্রের নানা প্রয়োজনে যার কাছে ছুটে যেতেন অনেকে, আজ সেই মানুষটির নিজেরই প্রয়োজন সহযোগিতা। দীর্ঘ চার দশক চলচ্চিত্র অঙ্গনে কাজ করা মিজানুর রহমান মিজানের চিকিৎসা যেন অর্থাভাবে থেমে না যায়, এখন পরিবারের প্রধান আকুতি সেটিই।

মিরাজ বলেন, আব্বার এই খারাপ সময়ে সুদিনের কেউ উপকারে আসেনি, স্বজনরাও না এমনকি সিনেমার মানুষরাও না। সিনেমা বা নাটক তো দেশের সংস্কৃতির বড় মাধ্যম। জীবনভর এখানে তার মত মানুষের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। পিছনে থেকে কত বিখ্যাৎ কাজের সাথে ছিলেন। তাই সরকারের পক্ষ থেকে যদি আব্বার চিকিৎসায় সাহায্য করা হয় তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো।

বিষয়:এফডিসি প্রডাকশন ম্যানেজার চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি জয় চৌধুরী মিজানুর রহমান মিজান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…