বাংলাদেশ

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়া দেশের জন্য গেম চেঞ্জার: আশিক চৌধুরী

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়া দেশের জন্য গেম চেঞ্জার: আশিক চৌধুরী

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আশিক চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, এনসিটি আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি তার জন্য একই সঙ্গে ‘ন্যাশনাল এবং পার্সোনাল’ হয়ে গেছে।

বন্দর খাতের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।

পোস্টে তিনি লিখেন, সম্প্রতি এক শ্রমিকনেতা তাকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। প্রথমে ৬০০ কোটি টাকা এবং পরে ভুল সংশোধন করে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। এ নিয়ে এক ইউটিউবার তাকে ‘ইকোনমিক হিটম্যান’ বলে ট্যাগ দিয়ে দিলেন। বুঝলাম, উনি পারকিনসের বইয়ের এক পৃষ্ঠাও পড়েন নাই। ইকোনমিক হিটম্যান কাকে বলে তাও জানেন না।

বন্দরটির সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের র‌্যাংকিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ৩৬৪তম অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দর রয়েছে ১১তম অবস্থানে। রপ্তানিমুখী দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ লিড টাইমের কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অর্ডার হারানোর কথা জানাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এনসিটিতে বর্তমানে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা বা ‘ইকুইপমেন্ট অ্যাভেইলেবিলিটি’ প্রায় ৭০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ হার ৯৩ শতাংশ। এ ছাড়া বন্দরের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

তিনি বলেন, এনসিটির সমস্যা শুধু অর্থের নয়। এর সঙ্গে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার বিষয়ও জড়িত। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত টার্মিনাল অপারেটরদের মাধ্যমে বন্দর পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

পোস্টে তিনি জানান, গত বছর লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা নিয়ে ইউরোপের মার্সক গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। বে টার্মিনাল নিয়ে সিঙ্গাপুরের পিএসএর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর ধারাবাহিকতায় এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম প্রায় আড়াই দিন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে তা গড়ে ২৪ ঘণ্টা। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে ঘণ্টায় গড়ে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় ৩৫টির বেশি বলে দাবি করেন তিনি।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিষয় প্রকাশ না করা নিয়েও পোস্টে ব্যাখ্যা দেন তিনি।

তার মতে, জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হলেও পুরো চুক্তি প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও পূর্ণ চুক্তির পরিবর্তে সারাংশ প্রকাশের সুপারিশ করে বলে দাবি করেন তিনি।

সবশেষে এনসিটি পরিচালনার চুক্তিকে দুর্নীতি দমন, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ উদ্যোগ দেশের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হবে বলেও মন্তব্য করেন।

পোস্টের কমেন্টবক্সে তিনি চুক্তির সারাংশ উল্লেখ করেন:
১. চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পারস্পরিক সম্মতিতে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে এই মেয়াদ বৃদ্ধি কার্যকর হবে না এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে পারবে।
২. চুক্তির শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি (আপফ্রন্ট ফি) পরিশোধ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
৩. টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১,০০০ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
৪. চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ন্যূনতম পরিমাণ সুরক্ষার (মিনিমাম ভলিউম গ্যারান্টি) ব্যবস্থা থাকছে।
৫. টার্মিনালের গড় আয় অনুযায়ী প্রতি টিইইউতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রয়্যালটি বা রাজস্ব অংশ (রেভিনিউ শেয়ার) পাবে যাতে আমাদের লভ্যাংশ একইরকম থাকে। যদিও আমি মনে করি সরকার ব্যবসা করার জন্য বন্দর করে না। মূল উদ্দেশ্য থাকে সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন।
৬. রেভিনিউ শেয়ারের পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে একটি নির্ধারিত ফি (ফিক্সড ফি) প্রদান করতে হবে।
৭. দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ট্রাকের বন্দরে অবস্থানকাল বা ক্রেনের উৎপাদনশীলতা (ক্রেন প্রোডাক্টিভিটি) এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি অর্জন করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা টানা তিন মাস অর্জিত না হলে আর্থিক জরিমানা প্রযোজ্য হবে।
৮. বন্দরের কর্মচারীদের চাকরি, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি নির্দিষ্ট ধারার মাধ্যমে সুরক্ষা করা হয়েছে।
৯. চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যকর পরিচালনাগত তদারকি অব্যাহত থাকবে। টার্মিনাল এলাকাজুড়ে সার্বক্ষণিক ভিডিও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (সিসিটিভি) বহাল থাকবে। পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতি সপ্তাহে ও প্রতি মাসে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে বিস্তারিত পরিচালনাগত তথ্য, যেমন জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের হিসাব ও মোট আয়ের প্রতিবেদন, কর্তৃপক্ষকে জমা দিতে হবে, যাতে কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে টার্মিনালের কার্যক্রম, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আদায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

বিষয়:আশিক চৌধুরী ইকুইপমেন্ট অ্যাভেইলেবিলিটি ইকোনমিক হিটম্যান এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ড

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…