চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কবরী আপা

ফরিদুর রেজা সাগর-এর বই 'প্রিয় মানুষ' থেকে

শিশুকিশোর সংগঠন কচি কাঁচার মেলা তখন দেশ জুড়ে সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি কেন্দ্রীয় কচি কাঁচার মেলার আহ্বায়ক। মেলা তখন প্রচুর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। সাহিত্য সভা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান। সকল অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত থাকতে পারতাম না। আমি তখন নানা কাজে জীবন জীবিকার জন্য খুব ব্যস্ত থাকি। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান। পত্রিকায় লেখালেখি। খাবার দাবার মাত্র শুরু হয়েছে। আমাকে ছুটে বেড়াতে হয়। তারপর সংসারের অনেক দায়িত্ব আমার ওপর। তাই দাদাভাই কখনও আমার উপর মনক্ষুণ্ন হতেন না। রাগ করতেন না। কিন্তু কাজের পরে ইত্তেফাক অফিসে বা কচি কাঁচার মেলা অফিসে ছুটে যেতাম। সন্ধ্যার পর মেলা অফিসে নানা কাজ করতাম।

মনে আছে, একবার ঠিক হলো প্রতিবারের মতো মেলার ভাইবোনেরা মিলে পিকনিকে যাওয়া হবে। কেউ একজন জাহাজের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। আমরা এক শীত সকালে ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাব। তারপর আবার ঢাকা ফিরে আসব। আমরা মহাখুশি। এক পর্যায়ে শুনলাম, এবার পিকনিকে আমাদের সফরসঙ্গী হবেন বিখ্যাত নায়িকা কবরী। শুনে আমরা মহা আনন্দিত। কবরীর সাথে বাবু সাহেবও (স্বামী বাবু সারওয়ার) যাবেন। সারওয়ার সাহেব তখন কচি কাঁচার মেলার নারায়ণগঞ্জ শাখার সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। বাসায় ফিরে যেই না বলেছি নায়িকা কবরী পিকনিকে যাবেন শুনে তো কণা রেজা লাফ দিয়ে উঠল। এক বাক্যে বলল, আমিও যাবো পিকনিকে। কবরী আমার প্রিয় নায়িকা। তার সঙ্গে কথা হবে। দারুণ ব্যাপার।

Reneta June

আমি হইচই করে কিছু বললাম না। কারণ কবরী আমারও প্রিয় নায়িকা। সুতরাং, আবির্ভাব, সাত ভাই চম্পা, নীল আকাশের নিচে, রংবাজ, ময়নামতি, তিতাস একটি নদীর নাম, সারেং বৌ, সুজন সখী কতসব বিখ্যাত ছবির নায়িকা তিনি। কে তার ভক্ত নয়!

বিজ্ঞাপন

এর পরও কবরী আমার অন্যতম প্রিয় ব্যক্তি। তিনি একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে কবরী জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য পুরো ভারতের মাটি চষে বেড়িয়েছেন।

যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে আমরা সদরঘাট থেকে জাহাজে উঠলাম। আমাদের মেলা অফিসের একজন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিত্ব মোস্তফা সারোয়ার। কাঁচা পাকা চুল। দীর্ঘদেহী। পরনে শাদা পাঞ্জাবি। তিনি কুমিল্লা মেলার উপদেষ্টা। জাহাজে উঠেই তার সঙ্গে দেখা। মনে মনে ভাবলাম, উনি কি বাবু সারওয়ারের কেউ হন?

প্রশ্ন করলাম, আপনি কি তার ভাই?

মোস্তফা সারওয়ার ভাই একগাল হেসে বললেন, আজ সবাই আমাকে এই প্রশ্ন করবে। আমি জানি।
উনি বললেন, এসো আমার সঙ্গে। পরিচয় করিয়ে দেই। তোমাদের সাথে।

কণা রেজা কবরীকে দেখে মুগ্ধ। কাছে গিয়ে গড়গড় করে বলতে লাগল কি কি সিনেমা সে দেখেছে নানা সময়ে।

সব শুনে কবরী মিষ্টি করে হাসতে লাগলেন।

আমিও অতি উচ্ছ্বাস ভরে নানা কথা বলতে লাগলাম। কবরী অতি অমায়িকভাবে বললেন, তোমরা একদিন বাসায় এসো। তোমাদের সঙ্গে গল্প হবে। দুপুরে খাবার সময় কবরী আপা কনাকে পাশে ডেকে নিলেন। খাবার সময়েও তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক গল্প বলতে লাগলেন কনাকে। কনা মহামুগ্ধ। কবরী আপার অসম্ভব আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।

চ্যানেল আই শুরু হবার পর নানাভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলেন কবরী আপা। আমন্ত্রণ জানালেই আমাদের নানা ইভেন্টে অতিথি হিসাবে আসতেন।

এমন কি চ্যানেল আই লাক্স পারফরমেন্স এ্যাওয়ার্ডে বেশ কয়েকবার আমাদের সাথে দুবাই গিয়েছেন। মঞ্চে পারফর্ম করেছেন দর্শক মাতিয়ে।

সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনেক অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত থাকতেন। মনে পড়ে, একটা গানের অনুষ্ঠানে তিনি রাজ্জাকের পাশে বসলেন। গান শুনলেন। এমন কি তাদের একটা বিখ্যাত গানে লিপসিং করলেন। উল্লেখ্য তার আগে বেশ কয়েক বছর ধরে রাজ্জাক-কবরী একসাথে অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছেন। দুইজন দুই মেরুতে থাকেন তখন। কিন্তু আমাদের অনুরোধে ‘তুমি যে আমার কবিতা’ গানটিতে লিপসিং করতে দ্বিধা করলেন না। পরস্পর হাত ধরে শটও দিলেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ঐ অনুষ্ঠানের পর থেকে রাজ্জাক-কবরী ছবিতে অভিনয়ও করেন একসাথে।

কবরীর প্রথম পরিচালিত ছবি আয়না। অঞ্জন চৌধুরী প্রযোজিত। পরে ছবিটি ইমপ্রেসের ঘরে আসে। কত স্মৃতিই না মনে পড়ে কবরী আপার সঙ্গে। ‘আয়না’ ছবি করতে গিয়ে তিনি বললেন, যে কোনো উপায়ে হোক সুভাষ দত্তকে এই ছবিতে অভিনয় করাতে হবে। কারণ সুভাষ দত্ত আমার প্রথম গুরু এবং তিনি ঠিকই গুরুকে একটি দৃশ্যে অভিনয় করিয়েছিলেন।

একটি স্মৃতি খুব মনে পড়ে। একবার দিল্লি গেলাম কবরী আপার সঙ্গে। তখন তিনি মাননীয় সংসদ সদস্য। তিনি আমাদের দলনেতা। দিল্লিতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। আমরা সেখানে যাচ্ছি। এয়ারপোর্টে এসে দেখা গেল কবরী আপার ভিসা শেষ হয়ে গেছে দুইমাস আগে। তিনি খেয়াল করেননি। শিল্পীসুলভ ভুলোমন। কবরী আপা ছিলেন খুবই সরল। সরকারি প্রতিনিধি এবং সংসদ সদস্য। এই জন্য ভিসা ছাড়াই তিনি যেতে পারলেন। সে যাত্রা তিনি ভারতে প্রবেশের অধিকার পেলেন। সরকারি বিশেষ ব্যবস্থায় তিনি দিল্লি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিলেন। ছিলেন জাতশিল্পী। বোধকরি তাই খুব উদাসী ও ভুলোমনের মানুষ। কিছুদিন ধরে কবরী আপা বলতেন, সাগর, আমি একটা ছবি বানাতে চাই। তুমি হবে প্রযোজক।

আমি বললাম, রাজি। কিছুদিনের মধ্যেই ‘এই তুমি সেই তুমি’। চিত্রনাট্যের জন্য অনুদান পেলেন। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটা শুরু করলেন। একদিন আমাদের অফিসে তার সঙ্গে ফিল্ম নিয়ে কথা হচ্ছে। এমন সময় খবর পাওয়া গেল সঙ্গীত পরিচলনার জন্য রুনা লায়লা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। শুনে কবরী আপা খুব খুশি।

তারপর কবরী আপা আমাকে সুধালেন,

সাবিনা ইয়াসমিন কি সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন?

আমি বললাম, না। তবে আপনার সাম্প্রতিক ছবিতে তাকে নিতে পারেন।

সাবিনা ইয়াসমিন কাজ করবেন?

আমাদের সঙ্গীত পরিচালক আযম বাবু বলে উঠল, নিশ্চয়ই করবেন। জাহাঙ্গীর সাঈদ আছেন, ও ম্যানেজ করে ফেলবে। কবরী আপা রাজি হলেন। ফিল্মের কাজ শুরু হলো। এই প্রসঙ্গে আরেকটি গল্প মনে পড়ছে। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘রংবাজ’ ছবিতে কবরীর কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গানটি। সে যে কেন এলো না..। গানটির শুরুতে .. ‘ধ্যাততারিকা’ একটা শব্দ আছে। সেই শব্দটি খুব বিখ্যাত হয়। কিন্তু গল্পটা হচ্ছে- কবরীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সাবিনা ইয়াসমিন ধৈর্যহারা হয়ে যান। তারপর গানের শুরুতে ‘ধ্যাততারিকা’ শব্দটি বলে উঠেছিলেন অনেকটা মেজাজ খারাপ করেই। শব্দটির উচ্চারণ ও প্রাসঙ্গিক হওয়ায় সঙ্গীত পরিচালকও তা আর কেটে ফেলেননি।

গল্পটি শোনাতেই কবরী আপা হেসে উঠলেন।

তারপর কাজ শুরু হলো। দেশজুড়ে করোনার লকডাউনও শুরু হলো। চারদিকে মহামারির আতংক। পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠল। কিন্তু অকুতোভয় কবরী আপা একদিন গান রেকর্ডিং করতে করোনার মধ্যেই চ্যানেল আই স্টুডিওতে এলেন। সঙ্গীত নিয়ে কাজ হবে। শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনকেও নিয়ে আসা হলো। কবরী আপা আমাকে ফোন দিলেন। বললেন, সাগর তুমি না এলে কি করে হয়? আজ তো ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কবরী-সাবিনা একসাথে কাজ করছে।

আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম,

আপা আমাকে তো বাসা থেকে বের হতে দিচ্ছে না। আম্মা খুব দুশ্চিন্তা করেন। শুটিংয়ের সময় আমি অবশ্যই যাব। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। কবরী আপা বললেন, সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপার না। তুমি এলে খুশি হতাম।

যথারীতি গানটা রেকর্ডিং হলো।

কী যে কষ্টের ব্যাপার। করোনা আক্রান্ত হয়ে আচমকা কবরী আপা সবকছিুর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে! কবরী আপা, আমি কিন্তু গভীর কষ্টের সাগরে ডুবে আছি। সারাজীবন এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে। গান রেকর্ডিং এর সময় আপনার সঙ্গে দেখা হলো না! এখানে আমার একটি সান্ত¦নার কথা বলা যেতে পারে। চ্যানেল আইয়ের জন্য কবরী আপা একটি ধারাবাহিক নাটক নির্মাণের আবদার করলেন বছর তিনেক আগে। জানালেন, ভিন্ন ধাঁচের এই নাটকটিতে তিনি এবং সোহেল রানাও অভিনয় করবেন (এপার ওপার-ছবির ‘মনেরও রঙে রাঙাবো গানটির ব্যাপারও থাকবে)। আমি রাজী হলাম। ‘আবার আসিব ফিরে’ শিরোনামে কবরী আপা তৈরি করলেন সেই সিরিজটি। যা তার পরিচালনায় কোনো টিভির জন্য একমাত্র প্রোডাকশন। বাঙালির স্মৃতিতে আপনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।