প্রতি বছর লাখ লাখ মুসলমান সৌদি আরবে হজ পালন করতে যান। তবে এবছরটা বাড়তি শোকাবহ হয়ে উঠেছে বহু মুসল্লির মৃত্যুর কারণে। এবারের হজযাত্রায় বিভিন্ন দেশের অন্তত ৯২২ জন হাজির মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগের জন্য দায়ী তীব্র গরম।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার এই যাত্রা শেষ হয়েছে বুধবার ১৯ জুন। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মৃত্যু এবং এনিয়ে সমালোচনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও বিবিসিকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর প্রায় ১৮ লাখ ৩০ হাজারের মুসল্লি হজে অংশগ্রহণ করেছেন যার মধ্যে ১৬ লাখই এসেছিলেন বিদেশ থেকে।
এই বছরের হজে এত বেশি মৃত্যুর কারণগুলো খতিয়ে দেখেছে আন্তর্জাতিক এই সংবাদ মাধ্যমটি
তীব্র গরম:
এবার সৌদি আরবে তাপমাত্রা ৫১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিকেই একটা বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উচ্চতাপ ও পানিশূন্যতা এড়াতে সতর্কতা জারি করলেও অনেক হাজি তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন।
দুই ডজনের বেশি দেশ থেকে হজ পালন করতে আসা মানুষের মধ্যে সর্বাধিক মৃত্যু হয়েছে মিশরীয়দের। একজন আরব কূটনীতিক জানিয়েছেন, মিশরের ৬৫৮ জনের প্রায় সবারই মৃত্যুর কারণ তীব্র গরম। এই হাজিদের অনেকেরই যথাযথ হজ পারমিট ছিল না, যার ফলে তাদের ক্ষেত্রে হাজিদের জন্য নির্ধারিত সহযোগিতা বা সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি ছিল।

অতিরিক্ত ভিড় এবং পরিচ্ছন্নতাজনিত সমস্যা
সৌদি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে, যার ফলে হজযাত্রীদের জন্য নির্ধারিত অনেক এলাকায় বিভিন্ন সংকট দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, থাকার জায়গা বা সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে ভালো ছিল না, ফলে তাঁবুগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় এবং পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত সুবিধার ঘাটতি ছিল।
ইসলামাবাদ থেকে আসা ৩৮ বছর বয়সী আমিনা (ছদ্মনাম) বলেন, মক্কার তাপে আমাদের তাঁবুগুলিতে কোনও এয়ার কন্ডিশনার ছিল না। যে কুলারগুলি বসানো হয়েছিল তাতে বেশিরভাগ সময় পানি ছিল না। এই তাঁবুগুলো এতটা শ্বাসরুদ্ধকর ছিল যে আমরা ঘেমে ভিজে যাচ্ছিলাম এবং এটি একটি ভয়ানক অভিজ্ঞতা ছিল।
জাকার্তার একজন হাজি ফৌজিয়া জানান, তাঁবুগুলোতে ভিড় এবং অতিরিক্ত তাপের কারণে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। আমরা গভীর রাত পর্যন্ত রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করেছি। তাঁবুর লোকেরা ক্ষুধার্ত ছিল।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই হাজিরা প্রায়শই দীর্ঘ পথ হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন। এজন্য তাদের অনেকে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা আটকে দেয়া এবং খারাপ পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাকিস্তানি বলেন, আমাদের সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেখানে কোনও পানি এবং ছায়া ছিল না। পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়ে আমাদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটতে বাধ্য করেছে। তার মতে, সৌদি সরকারি যানবাহন পাওয়া গেলেও গরমের কারণে অসুস্থ ও অজ্ঞান হয়ে পড়া তীর্থযাত্রীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ক্যাম্পে মানুষকে মুরগি বা খামারের পশুর মতো রাখা হয়েছিল, দুই বিছানার মাঝে দিয়ে যাওয়ার মতো জায়গা ছিল না এবং কয়েকটি টয়লেট শত শত মানুষকে ব্যবহার করতে হয়েছে।

বিলম্বিত চিকিৎসা সহায়তা
অনেক হাজিই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাননি বলে জানা গেছে। অনেকে বলছেন যারা তীব্র গরমে ক্লান্তি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগেছেন তাদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স বা প্রাথমিক চিকিৎসা সহজে পাওয়ার উপায় ছিল না।
আমিনা নামের এক হাজী বলেন, তার এক সহযাত্রীর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে অক্সিজেন প্রয়োজন ছিল, তখন তাদের বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্স আসতে ২৫ মিনিটেরও বেশি সময় লেগেছিল। অবশেষে, একটি অ্যাম্বুলেন্স আসে এবং ডাক্তার তাকে ভালো মত না দেখেই বলেন যে তার কিছু হয়নি।

অনুমতি ছাড়া হজ পালন
হজ করতে, একজন হাজিকে একটি বিশেষ হজ ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। কিন্তু কিছু ব্যক্তি সঠিক কাগজপত্র ছাড়াই হজে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই “অনুমোদনহীন হজকে” অতিরিক্ত মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। যারা সঠিক কাগজপত্র ছাড়া হজ করেন তারা কর্তৃপক্ষকে এড়িয়ে চলেন, এমনকি সাহায্যের প্রয়োজন হলেও।
একজন আরব কূটনীতিক জানান, এই মৌসুমে অন্তত ৬৫৮ জন মিশরীয় মারা গেছেন, যার মধ্যে ৬৩০ জনের হজ পারমিট ছিল না।
বয়োজ্যেষ্ঠ, রুগ্ন বা অসুস্থ তীর্থযাত্রী
হজে প্রতি বছর মৃত্যুর আরেকটি কারণ কারণ হলো বয়োজ্যেষ্ঠ, রুগ্ন বা অসুস্থ তীর্থযাত্রী। তাদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায় বলে মনে করছেন অনেকেই।








