পানি জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা, পুষ্টি পরিবহন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে অনেকেই বেশি পরিমাণে পানি ও তরল গ্রহণ করছেন, যাতে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং ডিহাইড্রেশন এড়ানো যায়।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পানও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। খুব বেশি পানি দ্রুত গ্রহণ করলে দেখা দিতে পারে “ওয়াটার ইনটক্সিকেশন” বা পানি বিষক্রিয়া, যা বিরল হলেও বিপজ্জনক।
ওয়াটার ইনটক্সিকেশন কী?
ওয়াটার ইনটক্সিকেশন তখনই ঘটে যখন অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত পরিমাণ পানি পান করা হয়। এতে কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, কারণ কিডনি অতিরিক্ত তরল বের করে দেয়ার দায়িত্বে থাকে। ফলে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বিশেষ করে সোডিয়াম পাতলা হয়ে যায়।
সোডিয়াম কোষের ভেতর ও বাইরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সোডিয়ামের মাত্রা কমে গেলে হাইপোনাট্রেমিয়া নামক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা কোষে, বিশেষ করে মস্তিষ্কের কোষে ফোলাভাব তৈরি করতে পারে।
শরীরের ভেতরে কী ঘটে?
অতিরিক্ত পানি গ্রহণ করলে রক্ত তরল হয়ে যায়, সোডিয়ামের মাত্রা কমে যায়, পানি কোষের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কোষ ফুলে যায়।
মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এই ফোলাভাব অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ খুলির ভেতরে প্রসারণের জায়গা নেই। ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে গুরুতর জটিলতা এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ওয়াটার ইনটক্সিকেশনের লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো হালকা হতে পারে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি, পেট ফাঁপা, ঘন ঘন প্রস্রাব
অবস্থা খারাপ হলে দেখা দিতে পারে বিভ্রান্তি বা দিশাহীনতা, পেশিতে টান বা দুর্বলতা, অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, খিঁচুনি ও শ্বাসকষ্ট।
গুরুতর ক্ষেত্রে কোমায় চলে যেতে পারে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যদিও এই সমস্যা বিরল, কিছু গোষ্ঠীর ঝুঁকি বেশি, দীর্ঘ দৌড়বিদ ও সহনশীল ক্রীড়াবিদ, অত্যন্ত কঠিন ব্যায়ামকারী ব্যক্তি, কিডনি বা হরমোনজনিত সমস্যায় আক্রান্তরা এবং দ্রুত ডিটক্স বা অতিরিক্ত পানি পানের অভ্যাসকারীরা।
কতটা পানি বেশি হয়ে যায়?
সবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। তবে সাধারণভাবে কিডনি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ০.৮ থেকে ১ লিটার পানি প্রক্রিয়া করতে পারে। এর বেশি দ্রুত পান করলে ঝুঁকি বাড়ে। তাই একবারে বেশি না খেয়ে সারাদিনে ধীরে ধীরে পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সঠিকভাবে হাইড্রেট থাকার টিপস
- ১. শরীরের সংকেত শুনুন, তৃষ্ণা লাগলে পানি পান করাই যথেষ্ট।
- ২. প্রস্রাবের রঙ লক্ষ্য করুন, হালকা হলুদ স্বাভাবিক হাইড্রেশন, গাঢ় হলুদ যদি হয় তাহলে পানির প্রয়োজন এবং একদম স্বচ্ছ হলে তা অতিরিক্ত পানি হতে পারে।
- ৩. কাজ ও আবহাওয়া অনুযায়ী পানি পান করুন। গরমে বা ব্যায়ামের সময় বেশি তরল প্রয়োজন হলেও একবারে বেশি নয়।
- ৪. পানি সমৃদ্ধ খাবার খান। তরমুজ, শসা, কমলার মতো ফল ও সবজি শরীরে তরল সরবরাহে সাহায্য করে।
- ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ
শুধু পানি নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামও শরীরের জন্য জরুরি। ঘাম বা ব্যায়ামের সময় ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত খাবার/পানীয় গ্রহণ করুন, অতিরিক্ত পানি পান করলে ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি এড়ান, সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
দৈনন্দিন হাইড্রেশনের পরামর্শ
সকালে এক গ্লাস পানি পান করুন, তবে অতিরিক্ত নয়, একসাথে বেশি না খেয়ে ধীরে ধীরে পানি পান করুন, শারীরিক পরিশ্রমে ধীরে ধীরে পানির পরিমাণ বাড়ান, সুষম খাদ্যের সাথে হাইড্রেশন বজায় রাখুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি যেমন জীবন রক্ষাকারী, তেমনি অতিরিক্ত পানি সঠিক ভারসাম্য নষ্ট করে বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সচেতনভাবে পানি পান করাই নিরাপদ হাইড্রেশনের মূল চাবিকাঠি।








