ধর্ম ও জীবন

মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ দুটোই কি থাকে? ইসলাম কী বলে

মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ দুটোই কি থাকে? ইসলাম কী বলে

ছবি: সংগৃহীত

মানুষ জন্মগতভাবে ভালো, নাকি মন্দ এ প্রশ্নের সরল উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে মানুষের সৃষ্টি, তার প্রবৃত্তি এবং ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষকে জন্মগতভাবে পাপী বা মন্দ সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং মানুষ ফিতরাহ বা স্বাভাবিক প্রকৃতি নিয়ে জন্মায়। একই সঙ্গে তার সামনে ভালো ও মন্দের পথ তুলে ধরা হয়েছে এবং তাকে বেছে নেওয়ার সক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যেক শিশু ফিতরাহ নিয়ে জন্মায়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক শিশু ফিতরাহর ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার বাবা-মা তাকে পরবর্তী ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায় এ কথা সহিহ মুসলিমের ২৬৫৮ নম্বর হাদিসে এসেছে।

এখানে ‘ফিতরাহ’ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। অর্থাৎ মানুষ এমন একটি স্বাভাবিক প্রকৃতি নিয়ে জন্মায়, যার সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া সঠিক পথের সম্পর্ক রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই হাদিসের সঙ্গে সূরা আর-রূমের ৩০ নম্বর আয়াতও উল্লেখ করেছেন।

তাই ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মের সময় একটি শিশুকে ‘খারাপ’ বা ‘পাপী’ হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই।

তবে মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ দুটিরই সম্ভাবনা রয়েছে

কোরআনে মানুষের আত্মা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাকে তার ভালো ও মন্দ দুই দিক সম্পর্কে সচেতন করেছেন। সূরা আশ-শামসের ৭ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে সে সফল এবং যে তাকে কলুষিত করে সে ব্যর্থ।

অর্থাৎ মানুষের চরিত্র একেবারে পূর্বনির্ধারিত নয়। তার সামনে ভালো ও মন্দের পথ রয়েছে। সে নিজের কাজ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোন পথে এগোবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কোরআনে দুই পথের কথা বলা হয়েছে

সূরা আল-বালাদের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষকে দুটি পথ দেখিয়েছেন। কোরআনের অনুবাদে এই দুই পথকে ভালো ও মন্দের পথ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আবার সূরা আল-ইনসানের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে পথ দেখিয়েছেন এরপর সে কৃতজ্ঞও হতে পারে, আবার অকৃতজ্ঞও হতে পারে।

এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম মানুষকে এমন একটি সত্তা হিসেবে দেখে, যার সামনে নৈতিক পছন্দের সুযোগ রয়েছে।

তাহলে মানুষ খারাপ হয় কেন?

ইসলাম শুধু জন্মগত প্রকৃতির কথা বলে থেমে যায় না। মানুষের আত্মশুদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সূরা আশ-শামসে বলা হয়েছে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা সফলতার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর তাকে কলুষিত করা ব্যর্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অর্থাৎ মানুষের স্বভাব ও চরিত্র গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে তার নিজের কাজ গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ ভালো কাজের মাধ্যমে নিজের চরিত্রকে উন্নত করতে পারে, আবার অন্যায় ও পাপের পথে চলতে চলতে নিজের আত্মাকে কলুষিতও করতে পারে।

পরিবার ও পরিবেশের প্রভাবও রয়েছে

শিশুর ওপর পরিবার ও পরিবেশের প্রভাবের কথাও হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক শিশু ফিতরাহর ওপর জন্ম নেয়, এরপর তার বাবা-মা তাকে বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়।

এ থেকে অন্তত এতটুকু বোঝা যায় যে মানুষের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তার বিশ্বাস ও পরিচয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ইসলাম ব্যক্তির নিজের দায়িত্বকেও গুরুত্ব দেয়।

ভুল করলেই কি মানুষ ‘মন্দ’ হয়ে যায়?

কোরআন-হাদিসের আলোচনায় মানুষকে শুধু একটি ভুল বা একটি পাপ দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে ‘মন্দ মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করার ধারণা পাওয়া যায় না। বরং আত্মশুদ্ধি, সঠিক পথে ফিরে আসা এবং ভালো কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় আলাদা করে মনে রাখা দরকার ভুল কাজকে ভালো বলা আর ভুল করা মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। ইসলাম অন্যায়কে অন্যায় হিসেবেই দেখে, একই সঙ্গে মানুষের সংশোধনের পথও খোলা রাখে।

তাহলে ইসলামের উত্তর কী?

ইসলামের আলোকে প্রশ্নটির সবচেয়ে তথ্যনির্ভর উত্তর হলো মানুষকে জন্মগতভাবে ‘মন্দ’ বলা হয়নি, মানুষ ফিতরাহ নিয়ে জন্মায়। কিন্তু তার মধ্যে ভালো-মন্দের পথ বেছে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং নিজের কাজের মাধ্যমে সে নিজের আত্মা ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ বা কলুষিত করতে পারে।

তাই মানুষ শুধু জন্মের সময় কেমন ছিল, সেটি দিয়ে তার পুরো চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না। সে কীভাবে জীবন কাটাচ্ছে, কী বেছে নিচ্ছে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে কীভাবে পরিচালনা করছে এসবও ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়:ইসলাম কী বলেভালো-মন্দমানুষ
প্রতিবেদক

ফারজিয়া হোসেন

নির্বাহী বিক্রয় ও বিপণন চ্যানেল আই

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…