এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
ভক্তরা বহুবার তাঁকে প্রশ্ন করতেন— “জুবিন দা… আপুনি মানুহ নে ভগৱান?” (জুবিন দা, আপনি মানুষ নাকি ঈশ্বর?)। তখন জুবিন গার্গ স্পষ্ট করে বলতেন, তিনি অন্য সবার মতোই একজন মানুষ, যিনি একদিন মৃত্যুবরণ করবেন।
তিনি বলতেন, “মানুষ ভাবে জুবিন গার্গ মানেই ঈশ্বর… আমি ঈশ্বর নই… আমি মরলে তোমাদের আমার চিতা জ্বালাতে হবে… সবাই ভাবে আমি সবকিছু পারি… কিন্তু যে আমাকে অতিরিক্ত ভালোবাসে, কখনও কখনও সেই ভুলও করতে পারে…”।
তবে তিনি কখনও বলেননি যে তিনি “মানুষ রূপে ঈশ্বর।”
কিন্তু আজ যখন তিনি নেই, তখন তাঁর জীবন, তাঁর উক্তি, তাঁর শেষ ইচ্ছাগুলো—সব যেন এক অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণীর মতো প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি যা বলেছিলেন, যে বিশ্বাসে বেঁচেছিলেন; এগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে চর্চা আরো বেড়েছে!
শেষ ইচ্ছা “মায়াবিনী রাতের বুকে”
এই বোনা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সুতোগুলোর একটি তাঁর শেষ ইচ্ছার সঙ্গে জড়িত। ২০১৯ সালে গুয়াহাটির বড়ুয়া কলেজে এক কনসার্টে তিনি বলেছিলেন— “আমি মরলে এই গানটা, ‘মায়াবিনী রাতিৰ বুকুত’(মায়াবিনী রাতের বুকে), বাজাতে হবে। এই গানটা আমার জন্য, তোমাদের জন্য, সবার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
সত্যিই, যখন তিনি প্রয়াত হলেন, আসাম শুনলো তাঁর সেই ইচ্ছা। সোনাপুরে তাঁর শেষকৃত্যে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে ‘মায়াবিনী’ গাইলো, যখন চিতা জ্বালানো হচ্ছিল।
যে গানকে তিনি নিজের স্বপ্ন বলেছিলেন, সেটিই পরিণত হলো শোক আর ভালোবাসার স্তবগীতে।
তাঁর যে কথা আজ মিথে পরিণত
জুবিন প্রায়ই বলতেন, “মোৰ কোনো জাতি নাই, মোৰ কোনো ধৰ্ম নাই, মোৰ কোনো ভগৱান নাই। মই মুক্ত। মইয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা।”(“আমার কোনো জাত নেই, আমার কোনো ধর্ম নেই, আমার কোনো ঈশ্বর নেই। আমি মুক্ত। আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা।”)
এই লাইনগুলো যেন মানুষ আর মিথের মাঝের সীমারেখা মুছে দেয়। সরাসরি “আমি ঈশ্বর” না বললেও, অনেকের কাছে এগুলো এমন একজনের কণ্ঠস্বর, যিনি ছিলেন সব সীমার বাইরে।
শেষ ঠিকানা, শেষ কবিতা
তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সোনাপুরে। সেই জায়গাতেই বহু বছর আগে ফটোশুট করেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্যকে।
যখন তাঁর মরদেহ সারুসাজাই স্টেডিয়ামে আনা হলো, তখন আকাশ কেঁদে উঠল। বৃষ্টি নামলো, আর হঠাৎ দেখা দিল এক রংধনু। যেন প্রকৃতিই তাঁর জীবনের কবিতাকে পূর্ণতা দিল।
তিনি একবার বলেছিলেন— “আমি মরলে আসাম স্তব্ধ হয়ে যাবে।” সত্যিই হলো তাই। তাঁর অনুপস্থিতিতে নিস্তব্ধ হয়ে গেল পুরো আসাম।
আবার তিনি প্রায়ই বলতেন— “আমি বুড়ো হবার আগে মারা যাবো।” সেটিও অদ্ভুতভাবে সত্যি হয়ে গেল। তাঁর জীবনে মৃত্যু ছিল বারবার ফিরে আসা এক সুর। বহু গানেই তিনি মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন, গেয়েছেন, যেন আগেভাগেই জানতেন এর আগমন।
তাঁর জীবনের শেষ গানও ছিল “বাতৰে শেষতে”, যার অর্থ— “পথের শেষ প্রান্তে।” সেই গানও যেন এক চিরবিদায়ের সুরে বাজলো।
অদ্ভুত সব ভবিষ্যদ্বাণী
জুবিন একবার সাহস করে বলেছিলেন— “আমি মরে যাওয়ার আগে এমন কিছু করবো, যা আগামী ১০০ বছরে আর কেউ পারবে না।”
সেটি সত্যিও হলো। তাঁর শেষযাত্রা এক অনন্য দৃশ্য হয়ে উঠলো। ২১ সেপ্টেম্বর, গুয়াহাটি দেখলো ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এলেন।
এই বিশাল অন্ত্যেষ্টি যাত্রা ইতিমধ্যেই লিমকা বুক অব রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গণঅন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার তালিকায়। মাইকেল জ্যাকসন, পোপ ফ্রান্সিস আর রানী এলিজাবেথের বিদায়-অনুষ্ঠানের পাশে উঠে এল জুবিন গার্গের নামও।
ঈশ্বরীয় সংযোগ নাকি গভীর ভালোবাসা?
তিনি যা বলেছিলেন, যা চেয়েছিলেন, যেভাবে মানুষ সাড়া দিয়েছে—এসব মিলেই যেন তৈরি হয় এক ঈশ্বরীয় আবহ। তাঁর মানবিকতা, তাঁর শিল্প, মৃত্যুর কথা খোলাখুলি বলা, শেষ ইচ্ছায় সেই একটি গান—এসবই মানুষকে অনুভব করিয়েছে তাঁকে এক দেবতুল্য উপস্থিতি হিসেবে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো আসল প্রশ্নটা এই নয়—তিনি ঈশ্বর ছিলেন কি না। আসল প্রশ্ন হলো, তাঁর জীবন আর মৃত্যুতে মানুষ কি কিছু বৃহত্তর দেখেছিল—একটা নিরাময়, একটা ভালোবাসা, এক অনন্ত উপস্থিতি।
আসামে আজও জুবিন গার্গ বেঁচে আছেন মৃত্যুর পরেও। আর সেটিই হয়তো তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রতিদিন টাইম







