দিনাজপুরের ব্রান্ডিং লিচুর কদর বেড়েছে। চলতি মৌসুমে বেদানা ও চায়না-৩ লিচু ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে রফতানি শুরু হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ধাপে ৩০০ কেজি লিচু রফতানি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ১০ হাজার কেজি লিচু রফতানি করার প্রস্তুতি চলছে।
আমদানিকারকদের চাহিদা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন জাতের লিচু শুধু ইউরোপে নয়, বিশ্বের উন্নত অন্য দেশগুলোতেও রফতানি করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। উৎপাদিত লিচু এই প্রথম বিদেশের বাজারে রফতানি হওয়ায় খুশি লিচু চাষি ও বাগানিরা।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের পরামর্শক্রমে দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহযোগিতায় চলতি মৌসুমে বেদানা ও চায়না-৩ লিচু ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে রফতানির উদ্যোগ নেয়া হয়। কমার্শিয়াল উইং, বাংলাদেশ দূতাবাস, ফ্রান্সের আমদানিকারকদের সাথে দিনাজপুর জেলা প্রশাসন দু’দফা বৈঠকের পর ৫ জুন পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ধাপে ৩০০ কেজি বেদানা লিচু দিনাজপুর থেকে ঢাকায় এবং ঢাকা থেকে প্যারিসে প্রেরণ করা হয়।
প্যারিসের বিমানবন্দরের ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় প্রেরিত লিচু উন্নত গুণগত মানসম্পন্ন বলে প্রমাণিত হওয়ায় তা ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সেই দেশের দূতাবাস ১০ জুন দিনাজপুর জেলা প্রশাসককে তা নিশ্চিত করেন। দ্বিতীয় ধাপে ১০ হাজার কেজি লিচু রফতানি করার প্রস্তুতি চলছে। আমদানিকারকদের চাহিদা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন জাতের লিচু শুধু ইউরোপে নয়, বিশ্বের উন্নত অন্য দেশগুলোতেও রফতানি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসক শাকিল আহমেদ জানান, আমরা সফল হয়েছি। আমাদের শ্রম কাজে লেগেছে। বিদেশের বাজারে এখন দিনাজপুরের লিচু বিক্রি হচ্ছে। এতে আনন্দ লাগছে। দিনাজপুরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এটা সম্ভব হয়ে দেশজননী প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এবং রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মো. হাবিবুর রহমানের কারণে। এতে আমাকে দিনাজপুরের সুযোগ্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) দেবাশীষ চৌধুরী এবং কৃষি বিভাগ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডস এর এম্বাসেডর এর সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে লাইভে লিচু বিক্রির ভিডিও দেখিয়েছেন, ছবি পাঠিয়েছেন। দিনাজপুর থেকে আমরা যেভাবে লিচু পাঠিয়েছে, সেই লিচু তেমনি আছে। পাতা এখনও সবুজ বর্ণ। আমরা চাই-আগামিতে আমরা আরও বেশ কিছু লিচু পাঠাবো। এজন্য প্রস্তুতি চলছে।

জেলায় পাঁচ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। এ বাগানগুলোতে লিচু উৎপাদন হয় প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন। তবে আবহাওয়া বিরূপ হওয়ায় এবার উৎপাদনে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। প্রচণ্ড তাপদাহে বিনষ্ট হয়েছে বেশকিছু লিচু। তবে এই প্রথম জেলার লিচু বিদেশে রফতানি হওয়ায় খুশি লিচু বাগানি ও চাষিরা। চরম লোকসানের মধ্যেও তারা আশার আলো খুঁজে পেয়েছেন লিচু চাষে।
দিনাজপুর বিরল উপজেলার জগতপুর এলাকার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অবসর প্রাপ্ত প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান জানান, এই প্রথম আমাদের জেলা তথা বিরল থেকে বিদেশে লিচু যাচ্ছে। আমার বাগান থেকেও কিছু লিচু নেয়া হয়েছে। এতে আমি খুবই খুশি। এবার তীব্র দাপদাহে লিচু নিয়ে খুবই দুঃচিন্তায় ছিলাম। কিন্তু আমাদের লিচু বিদেশে যাচ্ছে, তা দেখে আমি অভিভূত।
একই কথা জানালেন বিরল উপজেলার লিচু চাষি মতিউর রহমান, রবিউল ইসলাম, আবুল কালামসহ অনেকেই। তারা খুবই খুশি তাদের বিরল একালার লিচু বিদেশে রফতানি হওয়ায়।
লিচু বেচা-কেনার হাক-ডাকে এখন সরব দিনাজপুর। বিষমুক্ত লিচু হওয়ায় এই জেলার লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। লাল টস্ টস্ রঙিন রসালো ও সুস্বাদু লিচু এখন ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছে। তাই লিচু বাগান দেখতে ও লিচু খেতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখন দিনাজপুরে ছুটে আসছে মানুষ।
রাজধানী ঢাকা থেকে দিনাজপুরে লিচুর বাগান পরিদর্শন এবং লিচু গাছ থেকে ছিঁড়ে খেতে আসা রুবায়েত-সীমা দম্পতি জানালেন, ‘এই গরমে দিনাজপুরে এসে একটা আলাদা ফিল করছি। বেশ ভালোই লাগছে। স্বচোখে লিচু বাগান দেখা এবং গাছ থেকে লিচু পেড়ে খাওয়া একটা আলাদা আনন্দ। যা জীবনে কখনো হয়নি। সাথে আমাদের ৫ বছরের শিশু পুত্রও এসেছে। আমরা বেশ মজা করছি।
শুধুমাত্র ইউরোপে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লিচু রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। লিচু রফতানির মাধ্যমে এ জেলার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি রফতানি আয় বৃদ্ধি পাবে। এতে বৃদ্ধি পাবে দেশের রাজস্ব আয়।








