‘নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (ডিআইএফএফ)। শনিবার (১০ জানুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসবের পর্দা ওঠে।
রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণ পরিণত হয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক মিলনমেলায়। উদ্বোধনী আয়োজনে জলতরঙ্গ গোষ্ঠী ও থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল স্বাগত বক্তব্যে জানান, এবার প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে উন্মুক্ত পরিবেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; পানি সম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “শুধু ঢাকা মানেই বাংলাদেশ নয়। আমাদের বিভাগীয় শহরেও অনেক দর্শক আছেন, যারা ভালো সিনেমা দেখতে চান।” আগামী বছর উৎসবকে আরও বড় পরিসরে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
চলচ্চিত্র সমাজে সচেতনতা তৈরির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। প্রথমবারের মতো এবার কক্সবাজারে এই চলচ্চিত্র উৎসবকে বর্ধিত করায় তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান, একই সঙ্গে এসময় তিনি পরিবেশবান্ধব আচরণের আহ্বান জানিয়ে প্লাস্টিকজাত পণ্য বর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছর দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, চলচ্চিত্র মানুষের মাঝে মূল্যবোধ, জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটায় এবং বৈশ্বিক সংকট, চাপ ও হতাশা মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করে।
উদ্বোধনী দিনের প্রথম প্রদর্শনী হিসেবে বিকেল ৫টায় দেখানো হয় চীনা পরিচালক চেন শিয়াং নির্মিত ‘উ জিন ঝি লু’ (The Journey to No End)। সন্ধ্যা ৭টায় প্রদর্শিত হয় ইরানি পরিচালক মোহাম্মদ আসাদানিয়ার চলচ্চিত্র ‘উইদাউট মি’। পাশাপাশি বাংলাদেশ–চীন সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে জাতীয় জাদুঘরে চীনা চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি বিশেষ প্রদর্শনী কর্নার উদ্বোধন করা হয়।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের কালচার কাউন্সিলর লিই শাওপেং এই আয়োজনকে ‘চীনা চলচ্চিত্র সপ্তাহ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চলচ্চিত্র বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া–যুক্তরাজ্যভিত্তিক নির্মাতা আলেকজান্দ্রা মার্কোভিচ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গল্প বলার ঐতিহ্যের প্রশংসা করেন।
৯ দিনব্যাপী এই উৎসবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯১টি দেশের মোট ২৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে। এবারের উৎসবের বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে— এশিয়ান ফিল্ম কম্পিটিশন, রেট্রোস্পেকটিভ, ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, বাংলাদেশ প্যানোরামা, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিলড্রেন ফিল্ম সেশন, উইমেন ফিল্মমেকার, শর্ট অ্যান্ড ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম, স্পিরিচুয়াল ফিল্ম এবং ওপেন টি বায়োস্কোপ।
উৎসবের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন মিলনায়তন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশসহ একাধিক ভেন্যুতে। এছাড়া ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি কক্সবাজারের লাবণী সৈকতে অনুষ্ঠিত হবে ওপেন এয়ার স্ক্রিনিং।
উৎসবের অংশ হিসেবে এবারও অনুষ্ঠিত হবে ‘ওয়েস্ট মিটস ইস্ট স্ক্রিনপ্লে ল্যাব’, যেখানে এশিয়ার নির্মাতাদের নির্বাচিত ১০টি প্রকল্পকে নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে। ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে মাস্টারক্লাস, যেখানে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা অংশ নেবেন।
১৮ জানুয়ারি সমাপনী দিনে বিকেল ৪টায় প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হবে উৎসবের সেরা চলচ্চিত্র এবং বিশেষ সংগীত পরিবেশন করবেন আহমেদ হাসান সানি।








