যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার গতি বাড়ার সাথে বিদেশে জব্দকৃত ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ মুক্তি দেওয়ার দাবিটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বিদেশি ব্যাংকে জব্দকৃত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির রাজস্বের মতো সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের এই কঠোর পদক্ষেপগুলো তেহরানের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করেছে।
১৯৭৯ সাল থেকে এই পদক্ষেপগুলো ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসছে। ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন জিম্মিদের আটকে রাখার ঘটনায় এটি প্রথম আরোপ করা হয় এবং পরবর্তীতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিষয়টি আরও জোরালো করা হয়। ।
বিদেশে ইরানের জব্দকৃত সম্পদের সঠিক পরিমাণ অস্পষ্ট হলেও, কিছু ইরানি প্রতিবেদন অনুযায়ী এর মোট পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি– যা দেশটির জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে এই অঙ্কটি আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে, মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর অনাবাসী সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ হাইড্রোকার্বন বিক্রি করে তেহরানের বার্ষিক আয়ের প্রায় তিনগুণ। তিনি বলেন, “এটি একটি বিশাল অঙ্ক, বিশেষ করে এমন একটি সমাজের জন্য যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞায় ভুক্তভোগী।”
যখন কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা, অন্য কোনো দেশের কোন ব্যক্তির সিকিউরিটি, সম্পত্তি, কোম্পানি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল সাময়িকভাবে আটক করে, তখন তাকে “সম্পদ জব্দকরণ” বলা হয়। আদালত, অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি কোনো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানও সম্পদ জব্দ করতে পারে। আদালতের আদেশ বা নিষেধাজ্ঞা, অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মতো কারণগুলো মালিকের এই সম্পদগুলো বিক্রি করার এবং তা থেকে আয় করার ক্ষমতাকে সীমিত করে।
বিভিন্ন দেশ দাবি করে, তারা অপরাধমূলক কার্যকলাপ, অর্থ পাচার বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে অন্যান্য দেশ, ব্যক্তি বা কোম্পানির সম্পদ জব্দ করে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের লক্ষ্যবস্তু করতে এটি করে থাকে।
ইরান ছাড়াও রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ভেনিজুয়েলা, লিবিয়া এবং কিউবা এমন কয়েকটি দেশ, যাদের সম্পদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো জব্দ করেছে।
ইরানের সম্পদ কোথায় জব্দ করা হয়েছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ইরাক এবং ইউরোপসহ বেশ কয়েকটি দেশে ইরানের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, জাপানে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের, চীনে কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে ৭ বিলিয়ন ডলার এবং ইরাকে ৬ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত ইরানি সম্পদ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছেও যথাক্রমে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার এবং প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি জব্দকৃত ইরানি সম্পদ রয়েছে।
এছাড়াও, কাতারের কাছেও প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার রয়েছে। কিন্তু সেই অর্থ ইরানকে পরিশোধ করার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পাঠানো হয়েছিল, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র আটকে দেয়।
গত ১০ এপ্রিল, পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বসতে রাজি হওয়ার আগেই, ইরানের সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এক্স-এ একটি পোস্টে বলেন যে, যেকোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ (বিদেশী ব্যাংকে জব্দকৃত আয়) অবশ্যই মুক্ত করতে হবে।
তার এক দিন পর, যখন ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হয়, কিছু প্রতিবেদনে বলা হয় যে ওয়াশিংটন ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে, কিন্তু মার্কিন সরকার শীঘ্রই এই দাবিগুলো নাকচ করে দেয়। আগামী দিনগুলোতে আলোচনার পরবর্তী পর্ব পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, এই বিষয় নিয়ে মতবিরোধ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই সংকটে ছিল, যা দেশটির তেল বাণিজ্যকে সীমিত করেছে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তি আধুনিকীকরণের ক্ষমতাকে সংকুচিত করেছে। মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন এবং মুদ্রা রিয়ালের মূল্যহ্রাস দেশটির সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যা যুদ্ধের সময় অবকাঠামোগত ধ্বংসের কারণে আরও জটিল হয়েছিল।
জব্দকৃত তহবিলে প্রবেশাধিকার পেলে তা প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে, জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক উন্নত করবে এবং নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে আসা দুর্নীতি নির্মূলের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু করবে।







