সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেছেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করা দান নয়—তাদের বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে ক্রিশ্চিয়ান এইড বাস্তবায়িত “এক্সপ্যান্ডিং সিভিক স্পেস থ্রু অ্যাকটিভ সিএসও পার্টিসিপেশন অ্যান্ড স্ট্রেংথেন্ড গভর্ন্যান্স সিস্টেম ইন বাংলাদেশ (ইসিএসএপি)” প্রকল্পের আওতায় সেমিনারটির আয়োজন করে গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সমষ্টি।
সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নে গণমাধ্যমে আরও নিয়মিত, গভীর এবং প্রতিনিধিত্বমূলক কভারেজ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মধ্যে আরও কাঠামোগত ও টেকসই সহযোগিতা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ও সঞ্চালনা করেন সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, “পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে, তবে তাদের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর করা সম্ভব। তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সংস্থা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনে না আনলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সমাজে নারীদের অদৃশ্য শ্রম এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে তা স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রান্তিক মানুষের বিষয়গুলো ‘চ্যারিটি’ নয়, ‘অধিকার’ হিসেবে দেখতে হবে।
ফারজানা শারমিন আরও বলেন, তথ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউনেস্কো বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইস বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি কমিউনিটি রেডিও ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা বাড়ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় মূলধারার গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
ক্রিশ্চিয়ান এইড-এর পার্টনারশিপ ও স্ট্র্যাটেজি লিড নুজহাত জাবিন বলেন, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার পাশাপাশি তাদের অর্জনগুলোও গণমাধ্যমে তুলে ধরা জরুরি।
অনলাইন পোর্টাল চরচা’র সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘‘সরকার বদল হয়, চেয়ার বদল হয়, কিন্তু মানসিকতা বদল হয় না। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।’’
জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মুহাম্মদ হিরুজ্জামান বলেন, সমাজের অসাম্য দূর করতে সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।
জরিপ, দলীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার এবং গণমাধ্যম বিশ্লেষণ ইত্যাদি মিশ্র পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিচালিত ‘জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর জোরালো করা: নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ গবেষণার মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। এরপর গবেষণার সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেন সমষ্টির গবেষণা পরিচালক রেজাউল হক।
১৫ জেলার ১৫৪ জনকে নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, ৮৪% প্রান্তিক মানুষ চান তাদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাক। ৬১% বৈষম্য, ৫৯% নিরাপত্তাহীনতা এবং ৫১% দৈনন্দিন ঝুঁকির বিষয় বেশি তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন; ২১% বলেন ইতিবাচক গল্প কম আসে।
সুপারিশে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ (৫২%), প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা (৪২%) এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোরালো অ্যাডভোকেসির (৪৩%) ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৬৪% বেশি কভারেজ, ৪৩% কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং ৩৬% তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
সেমিনারটিতে আরও উপস্থিত ছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার লায়লা জাসমিন বানু, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ব্যারিস্টার খলিলুর রহমান খান, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের (উই ক্যান) নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক।
অন্যান্য বক্তারা নাগরিক সংগঠন, গণমাধ্যম, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো আরও সুসংগঠিতভাবে জনপরিসরে উঠে আসে এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।
অংশগ্রহণকারীরা গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নে বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ, সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।







