এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
দেশের আর্থিক খাত তথা ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি, লুটপাট, খেলাপী ঋণ ও বিদেশে অর্থ পাচারে গত দুই দশকে যে মহাপ্রলয় ঘটে গেছে তার জন্য আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দায়ী। সম্প্রতি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে মানুষ স্বস্তি পেয়েছে এই ভেবে যে, এতদিন যে পালের গোদারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে অর্থপাচার করেছে তাদের মধ্যে শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে।
দেশের শীর্ষ পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠী কর ফাঁকি দিয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্তে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে।
ধারাবাহিকভাবে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আয়কর আইন, ২০২৩ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে না দেওয়া কর উদ্ধারের পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণের মানদণ্ডে এস আলমকে বলা যেতে পারে দুর্নীতি কূলশিরোমণি। বাংলাদেশ ব্যাংক তার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমাদের প্রচলিত আইনে যেহেতু ঋণখেলাপীদের সম্পত্তি জব্দে কোনো বাধা নেই তাই বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্ণর বলেছেন, সাইফুল আলমের সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যাংকের আমানতকারীদের আমানত ফেরত দেওয়া হবে।
ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুন্ঠন করা হয়েছে। কখনো ব্যাবসা ও শিল্পের ঋণের নামে, কখনো সরাসরি জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে এই ব্যাংক লুন্ঠনের ঘটনাগুলো ঘটছে। গত দেড় দশকে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, ফারমার্স ব্যাংক ইত্যাদি বহু ব্যাংক কেলেঙ্কারির খবর গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এইসব লুটপাটকে কোন ভাবেই কেলেংকারি বলা যায় না, কোন ঘটনা হঠাৎ একবার ঘটলে সেটাকে কেলেংকারি বলা যেতে পারে, এটা হলো জনগণের অর্থ লুট করে পুঁজিপতি তৈরির ধরাবাহিক ম্যাকানিজম; এটা তাই অনিয়ম নয়, দুঃশাসনের ফলে সৃষ্ট।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। গত ২২ আগস্ট ২০২৪ এর পরে আমরা ভেবেছিলাম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক লুটেরাদেরকে ধারাবাহিকভাবে আটক করে বিচারের আওতায় আনা হবে। কিন্তু এই ঋণখেলাপীদের তালিকায় থাকা শীর্ষস্থানীয় অনেকেই কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সীমান্তে ম্যানেজ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তাদের মধ্যে ব্যাংক খাতের অন্যতম শীর্ষ দুষ্কৃতকারী সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এ্যাণ্ড কমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়েছেন।
৯ আগস্ট ২০২৪ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে ভারতে যাওয়ার সময় শিল্পপতি এস এম আমজাদ হোসেনকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। প্রথম আলোর ঐ সংবাদে আরও জানা যায়, আমজাদ হোসেন সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে তিনি লকপুর গ্রুপের মালিক। তার হিমায়িত মৎস্য ও ফুড প্রসেসিং প্যাকেজিং, অটোব্রিকস, টাইলস ইন্ডাস্ট্রি ও ডেভেলপারসহ একাধিক ব্যবসা রয়েছে। তিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র ও খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেকের ঘনিষ্ঠজন। তার বিরুদ্ধে বন্ড জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এই সংবাদ প্রকাশের পরের দিনই (১০ আগস্ট ২০২৪) এসএম আমজাদ হোসেন তার ফেসবুক পোস্টে জানান, তিনি ব্যবসায়িক কাজে ভারতে যাচ্ছিলেন তাই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাকে ছেড়ে দেয়। একজন শিল্পপতি আকাশপথে না গিয়ে স্থলপথে ভোমরা, সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে যাওয়াটা প্রমাণ করে মানুষের আমানত খেয়ানত করার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করে পালিয়ে যাওয়াই তার মূল উদ্দেশ্য।
যারা ভালো ব্যবসায়ী তাদের একজনকেও আমরা স্থলপথে কিংবা আকাশপথে ভারত হয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমাতে দেখিনি। অসাধু ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিতে সিদ্ধহস্ত। শত শত এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিদেশে যারা টাকা পাচার করেছে তাদের বেশিরভাগই পালিয়ে গেছে।
ঋণ পরিশোধ না করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীরা ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থায়ী আবাস গড়েছেন। এসব ব্যবসায়ী ভোগ্যপণ্য, শিপ ব্রেকিং, গার্মেন্টস, আবাসন, কৃষি ও পরিবহন খাতে বিনিয়োগের কথা বলে দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন।
২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাতীয় সংসদে ঋণখেলাপি ৮ হাজার ২৩৮ জন ব্যক্তি বা কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ডয়েচে ভেলের ২৯ জুন, ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, গত ডিসেম্বরে যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা৷
ঋণখেলাপীদের তালিকা প্রকাশে বিগত সরকার অনীহা প্রকাশ কার স্বার্থে করেছিল তা বুঝতে কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আশার খবর এই যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পাঁচটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ ঋণখেলাপীদের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সমর্থ হবে বলে দেশবাসী মনে করছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপগুলো হলো:
এক. ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগ
দুই. কালো টাকা সাদা করার বিধান বাতিল করা
তিন. বিদেশে পাচার হওয়া মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা
চার. অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করা
পাঁচ. ঋণখেলাপীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা
এখানে উল্লেখ্য যে, ঋণখেলাপীদের আটকের হার তুলনামূলকভাবে কম পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ তারা বেশিরভাগ আগেই পালিয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো পালিয়ে থাকা ঋণখেলাপীদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কী হবে? কারণ পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে তারা টাকা সরিয়ে নিয়েছে। শুধু তাই নয় ঋণখেলাপীদের অনেকে বিদেশে পালিয়ে থাকলেও তাদের স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা সদর্পে দেশে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে ও বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করছে। অথচ ঋণখেলাপীদের স্ত্রী ও সন্তানরাও তাদের ব্যবসায়ের অংশীদার ও অপরাধের ভাগীদার।
ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক খোদ আওয়ামী লীগ আমলেই সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এ্যান্ড কমার্স (এসনিএসি) ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেন এর স্ত্রী সুফিয়া আমজাদ ও তার একমাত্র মেয়ে তাজরি আমজাদসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তারপর আমজাদ ও তার পরিবার আমেরিকা পালিয়ে থাকার পর তৎকালীন সরকারের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে আবার দেশে ফিরে আসেন। কোনো ঋণখেলাপীরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এ দেশ যেন ব্যাংক লুটেরাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর আমজাদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার মেয়ে দেশেই তার শ্বশুর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের বাসায় নির্বিঘ্নে অবস্থান করছেন। খুশির খবর এই যে, গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ১৩০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপী আনসারুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় আটক হয়েছেন। তাই নাগরিক সমাজের দাবি শুধু লুট হয়ে যাওয়া টাকা নয় তার সাথে লুটেরাদরও দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
পালিয়ে থাকা ব্যাংক ডাকাত এবং লুটেরাদের ইন্টারপোল ও আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে দেশে ফেরত আনা না হলে অর্থনীতি চাঙা হবে না, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে না এবং কর্মসংস্থান বাড়বে না। ঋণ খেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সমাজে বৈষম্য কমবে না, গ্রাহকরা তাদের আমানত ফিরে পাবে না এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরে আসবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি তাই জনগণের প্রত্যাশা অনেক।
একটা কুচক্রী মহল অসাধু ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে ধোঁয়া তোলার চেষ্টা করছেন এই বলে যে, দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে যদি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ অর্থনীতিতে তারল্য সংকটের পেছনে প্রধান কারণ হলো খেলাপি ঋণ। আমাদের অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে খেলাপি ঋণ। এর ফলে সমাজে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরীবরা আরও গরীব হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার বা ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থিক খাতের গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি (জিএফআই)। সংস্থাটি বলছে, প্রতি বছর গড়ে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট এই দেশ থেকে! যার বড় একটি অংশই পাচার হয়েছে তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে।’ দুর্নীতি বন্ধ না হলে খেলাপি ঋণ বন্ধ হবে না। সুতরাং আসুন আমরা সকলে সোচ্চার হই ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সার্থক হবে যদি অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণ মানুষের আমানত খেয়ানতকারী, দেশ ও জাতির শত্রু, ব্যাংক লুটেরা, ঋণখেলাপী ও বিদেশে অর্থপাচারকারীদের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মাধ্যমে টাস্ক ফোর্স গঠন করে বিচারের আওতায় এনে একটা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








