নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে হওয়া প্রথম মামলা পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনে গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনির মৃত্যুতে তিন পুলিশের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এই মামলার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ৩ আসামীর করা আপিলের শুনানি শেষে বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সোমবার রায় ঘোষণা করেন।
আজকের রায়ে বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পল্লবী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।
এছাড়া বিচারিক আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এএসআই কামরুজ্জামান আপিল না করে পলাতক থাকায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকবে। সেই সাথে এই দুজনকে বিচারিক আদালতের দেয়া এক লাখ টাকা করে জরিমানা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার রায় বহাল রাখা হয়েছে।
তবে বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল হাসানের সাজা কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই সাথে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, এই মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে সাত বছর কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা হওয়া পুলিশের সোর্স রাসেলের দণ্ড বাতিল করে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অপর আসামী পুলিশের সোর্স সুমন সাত বছরের দণ্ড ভোগ করে কারামুক্ত হয়েছেন।
হাইকোর্টের এই মামলায় আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান, সরওয়ার আহমেদ, মো. আবদুর রাজ্জাক ও নাজমুল করিম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বদিউজ্জামান তপাদার। অন্যদিকে বাদীপক্ষে আইনজীবী এস এম রেজাউল করিম শুনানি করেন।
এই মামলার বিবরণে থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ইরানি ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. বিল্লালের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান ছিল। সে অনুষ্ঠানে পুলিশের সোর্স সুমন নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। এ সময় সেখানে থাকা ইশতিয়াক ও তার ভাই ইমতিয়াজকে সুমন চলে যেতে বলেন। এ নিয়ে সুমনের সঙ্গে দুই ভাইয়ের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সুমনের ফোনে পুলিশ এসে ইশতিয়াক ও ইমতিয়াজকে ধরে নিয়ে যায় এবং থানায় নিয়ে দুই ভাইকে নির্যাতন করে। এতে ইশতিয়াকের অবস্থা খারাপ হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ইশতিয়াকের ভাই ইমতিয়াজ হোসেন ওই বছরের ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট মামলা করেন। সে মামলায় তৎকালীন পল্লবী থানার এসআই জাহিদুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়।
একপর্যায়ে এই মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।সে তদন্ত প্রতিবেদনে পাচজনকে অভিযুক্ত এবং পাঁচজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। তদন্তকালে এএসআই রাশেদুল ও কামরুজ্জামানকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মামলায় পাচ আসামি বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর বিচার শেষে ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রায় দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ। সে রায়ে পল্লবী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল হাসান ও এএসআই কামরুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। তাদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অপর দুই আসামি পুলিশের সোর্স (তথ্যদাতা) সুমন ও রাসেলের সাত বছর কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন বিচারিক আদালত।
এদিকে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জাহিদুর, রাশেদুল ও রাসেল ২০২০ সালে হাইকোর্টে পৃথক আপিল করেন। ২০২১ সালে হাইকোর্ট সে সব আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। গত ৯ জুলাই এসব আপিল হাইকোর্টে একসঙ্গে শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে আজ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।








