‘জয় বাংলা’ নিয়ে সিপিবিতে সংকট, ১০ নেতাকে শোকজ ঘিরে নতুন বিতর্ক

মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অভ্যন্তরে মতবিরোধ এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্লোগানটিকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে উত্তেজনা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পর এবার আলোচনায় এসেছে ১০ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি। এতে সিপিবির ভেতরে রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৬ অক্টোবর। সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করে পুলিশ। পরে তিনি মুক্তি পেলে পুরানা পল্টনে সিপিবির কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল বের হয়।
মিছিল শেষে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হলে সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সিপিবির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যুবদল ও ছাত্রদলের পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি স্লোগানের বিরোধিতা করে তাদের ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবনের সামনেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলায় দুজন নেতাকর্মী আক্রান্ত হন।
তবে সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, দলীয় কার্যালয় থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে পুলিশ জানায়, দীপক শীলের মুক্তির পর তার সমর্থকেরা ওই স্লোগান দিয়েছিলেন।
স্লোগান নিয়ে দুই অবস্থানে নেতারা
হামলার ঘটনার পর সিপিবির ভেতরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলেও ১৯৭২ সালের পর দলীয় কর্মসূচিতে এই স্লোগান ব্যবহৃত হয়নি।
তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হননি দলের কয়েকজন নেতা।
সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা মিহির ঘোষ পাল্টা বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দলের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান বিভিন্ন কর্মসূচিতে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও সিপিবির নেতাকর্মীরা এই স্লোগান ব্যবহার করেছেন।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সও বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘জয় বাংলা’ ছিল সর্বজনীন স্লোগান। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত আন্দোলনে পরবর্তী সময়েও কমিউনিস্টরা এই স্লোগান দিয়েছেন।
দলের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খানও মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের এই স্লোগানের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির কোনো বিরোধ নেই।
ফলে বিতর্কটি কেবল একটি স্লোগান ব্যবহার করা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিপিবির রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির অবস্থানের প্রশ্ন।
১০ নেতাকে শোকজের প্রশ্নে নতুন সংকট
এই বিতর্কের মধ্যেই সিপিবির ১০ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তবে নোটিশগুলো সরাসরি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার কারণে, নাকি এ নিয়ে প্রকাশ্যে মতপ্রকাশ বা দলীয় শৃঙ্খলাসংক্রান্ত অভিযোগে দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, নাকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা?
‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান স্লোগান। তবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে স্লোগানটি দলটির পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্লোগানটির রাজনৈতিক ব্যবহার নতুন বিতর্কের মুখে পড়ে।
সিপিবির একাংশের বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্লোগানকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অন্য অংশের যুক্তি, সিপিবির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও স্লোগান রয়েছে; বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘জয় বাংলা’ ব্যবহারের রাজনৈতিক তাৎপর্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সাধারণ সম্পাদক ক্বাফী রতন অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলেই তার ওপর হামলা চালানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
সামনে কী সিদ্ধান্ত নেবে সিপিবি?
সিপিবির বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহারের বিষয়ে দলটির আনুষ্ঠানিক অবস্থান কী হবে? দ্বিতীয়ত, নেতাদের প্রকাশ্য মতপার্থক্যকে দলীয় শৃঙ্খলার সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে? তৃতীয়ত, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়লে দলটির ঐক্যে তার কী প্রভাব পড়বে?
একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, অন্যদিকে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা; এই দুইয়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হচ্ছে সিপিবিকে।
একটি স্লোগানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক তাই এখন দলটির রাজনৈতিক পরিচয়, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সাংগঠনিক ঐক্যের বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে।






