বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, কমরেড মণি সিংহের জীবনসংগ্রাম অনুসরণ করে মানবমুক্তির আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে এবং দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মোকাবিলা করতে হবে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা এবং টঙ্ক আন্দোলনের নেতা কমরেড মণি সিংহের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার পোস্তগোলায় তাঁর স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আয়োজিত স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সিপিবির সূত্রাপুর থানা কমিটির সভাপতি বিকাশ সাহার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বী খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা ও শ্রমিক নেতা আসলাম খান, সাবেক ছাত্রনেতা সামসুল আলম, সূত্রাপুর থানা কমিটির সরকারি সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীল।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দেশে আজ চরম সংকট চলমান। অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে একের পর এক দেশবিরোধী সর্বনাশা বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর পরামর্শে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় হাটছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে চার কোটি কর্মক্ষম মানুষ বেকার, ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী ও দক্ষিণপন্থীদের উত্থান ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, কিন্তু সরকারের টনক নড়ছে না। দেশের আইন-শৃঙ্খলা নাজুক অবস্থায়। তাই আজ কমরেড মণি সিংহের সাম্যবাদী আদর্শ ও সংগ্রামী জীবন অনুসরণ করে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও শোষণ-বঞ্চনার মূল কারিগর সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদ এবং তাদের সৃষ্ট মৌলবাদ, লুটেরা ব্যবসায়ী, লুটেরা আমলা এবং লুটেরা রাজনীতির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের মুক্তি, সমাজের মুক্তি এবং প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম পরিচালনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, এই জাতীয় কর্তব্য পালনে কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী শক্তি সম্মিলিতভাবে মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

সভাপতির বক্তব্যে বিকাশ সাহা বলেন, কমরেড মণি সিংহ কিশোর বয়সে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত হন। তরুণ বয়সে তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে বস্ত্রকল শ্রমিকদের প্রিয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের পশিাপাশি মানুষের মুক্তির জন্য মার্কসবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবিচল ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন গড়ে ওঠে। কমরেড মণি সিংহ ছিলেন টঙ্ক আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড মণি সিংহ কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক। দীর্ঘ কারাবাস, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াই, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার নিরলস সংগ্রাম এবং সংগঠন গড়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে
অন্যান্য বক্তারা বলেন, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বক্তারা আরও বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে সততা, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের জন্য কমরেড মণি সিংহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। এর আগে, কমরেড মণি সিংহের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গেন্ডারিয়া শাখা, দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)সহ বিভিন্ন সংগঠন।
পরে সমবেত কণ্ঠে ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে স্মরণসভার সমাপ্তি হয়।







