পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, রাজধানী ঢাকার কোরবানির পশুর হাটগুলো ততই জমজমাট হয়ে উঠছে। ট্রাকের পর ট্রাক গরু আসছে, ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন, আর ক্রেতারা দাম-দরদাম করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে হাটে মানুষের উপস্থিতি বাড়লেও সেই তুলনায় বিক্রি এখনো জমে ওঠেনি। অনেকেই হাটে এসে গরু দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, ছবি তুলছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিনছেন না।
আজ (২৩ মে) শনিবার রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোতে দেখা গেছে, ক্রেতারা দাম যাচাই করে অপেক্ষা করছেন আরও কমার আশায়। আর বিক্রেতারা তাকিয়ে আছেন ঈদের আগের শেষ কয়েক দিনের দিকে, যখন জমে উঠবে আসল বেচাকেনা। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ভাষায়, ‘দেখে বেশি, কেনে কম’ এখনকার হাটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা এটিই। তবু শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অস্থায়ী হাটগুলোয় আছে উৎসবের আমেজ।
এবার ঢাকায় অস্থায়ী ২১টি কোরবানির পশুর হাট বসেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১১টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১০টি হাট রয়েছে। স্থায়ী গাবতলী ও সারুলিয়া হাটের পাশাপাশি উত্তরার দিয়াবাড়ি, মিরপুর, বাড্ডা, মেরুল, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী হাট বসেছে।

রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোতে এখন ভিড় বাড়লেও বেশিরভাগ ক্রেতাই এখনো ‘দেখে যাওয়ার’ পর্যায়ে আছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের আগের তিন থেকে চার দিনেই জমে উঠবে আসল বেচাকেনা। কারণ, বেশিরভাগ মানুষ এখনও অপেক্ষা করছেন দাম কিছুটা কমবে কি না, সেটিই দেখতে।
ক্রেতাদের অনেকেই মনে করেন, হাটের শুরুর দিকে বিক্রেতারা তুলনামূলক বেশি দাম হাঁকান। কারণ তখন গরুর সরবরাহ নতুন থাকে এবং বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি থাকে। তাই অনেকে শুরুতেই গরু না কিনে কয়েকদিন অপেক্ষা করেন, যেন দরদাম করে কম দামে ভালো গরু পাওয়া যায়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
উত্তরার দিয়াবাড়ি হাটে গিয়ে দেখা গেছে প্রচুর গরু এসেছে। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দেশি ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরুর সরবরাহ ভালো। তবে ক্রেতাদের মধ্যে মাঝারি ও ছোট গরুর চাহিদা বেশি। ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার মধ্যে ভালো মানের গরু পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
গরু ব্যবসায়ী মনির বলেন, সবাই আসে-দাম জিগায় তারপর কিছু না বইলাই যায় গা। তবে সোমবার থেকে আসল বেচা-কিনা শুরু হবে বলে মনে করেন তিনি।

রাজধানীবাসীর আগেভাগেই পশু না কেনার আরেকটি বড় কারণ হলো সংরক্ষণ ও দেখভালের ঝামেলা। যারা শহরে থাকেন, তাদের অনেকের বাসায় গরু রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। আগেভাগে গরু কিনলে খাবার, পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা চাপ তৈরি হয়। এজন্য অনেকেই চান ঈদের এক-দুই দিন আগে গরু কিনে সরাসরি কোরবানির প্রস্তুতিতে যেতে।
নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গরু চুরি, অসুস্থ হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত খরচের ভয়েও অনেকে আগে গরু কিনতে চান না। বিশেষ করে ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে দীর্ঘ সময় পশু রাখার জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা দরকার হয়, যা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অন্যদিকে অনেক ক্রেতা বাজার পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে চান। ঈদের যত সময় ঘনিয়ে আসে, হাটে গরুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন একই বাজেটের মধ্যে তুলনামূলক বেশি বিকল্প পাওয়া যায়। ফলে ক্রেতারা বিভিন্ন হাট ঘুরে দাম যাচাই করে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়াকেই সুবিধাজনক মনে করেন।
গাবতলী হাটে বিক্রি শুরু হয়েছে জোরেশোরে। বড় বড় গরু ও মহিষের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য মাঝারি সাইজের গরু আনা হয়েছে। হাটে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গরুর ডাক, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের দরদামের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
একই চিত্র তেজগাঁওতে। রাজশাহী থেকে আসা গরু বিক্রেতা সাইদ বলেন, বেচা নাই কোন, সবাই এসে শুধু দাম জানতে চায়, কেউ এখনও কিনে না। তবে এখন কিনলে সামান্য লাভেই গরু ছেড়ে দিতাম। আজ (শনিবার) সন্ধ্যার পর থেকে লোক বেশি আসবে বলে মনে করেন তিনি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় খরচ কিছুটা বেশি পড়লেও সরবরাহ ভালো থাকায় দাম স্থিতিশীল রয়েছে। অনেক ক্রেতা আগেভাগেই হাটে এসে পছন্দের পশু কিনে নিচ্ছেন যাতে শেষ মুহূর্তে ভিড় ও দাম বৃদ্ধি এড়ানো যায়।
একজন ক্রেতা জানান, পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী মাঝারি সাইজের গরু খুঁজছি। দাম যেন যৌক্তিক হয়। অন্যদিকে বিক্রেতারা আশা করছেন, ঈদের আগের কয়েকদিনে বেচাকেনা আরও বাড়বে।
রাজধানীর এই জমজমাট গরুর হাট শুধু কোরবানির প্রস্তুতিই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে শহুরে জীবনের এক মিলনক্ষেত্রও বটে। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে এই ব্যস্ততা রাজধানীবাসীর মধ্যে উৎসবের আনন্দ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।








