ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ না করেই তা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাসভিত্তিক দ্রুতগতির পরিবহনব্যবস্থার মূল পরিকল্পনা থেকেও সরে আসছে সরকার। এখন বিআরটি করিডোর সাধারণ সড়কের মতো ব্যবহার করা হতে পারে। এ পথে টোল আদায়ের ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রায় সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হলেও দেশের প্রথম বাস র্যাপিড ট্রানজিট করিডোর তৈরির উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল রাজধানী ও গাজীপুরের মধ্যে যানজট কমিয়ে দ্রুতগতির গণপরিবহন চালু করা। কিন্তু ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি চালু হয়নি। বরং বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ করিডোর যানবাহনের গতি বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি হয়েছে উল্টো। সড়কের দুই পাশ সংকুচিত হয়ে যানজট বেড়েছে। অনেক বিআরটি স্টেশন এখন মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দিনের বেলাতেও অনেক পথচারী এসব স্টেশনের সামনে দিয়ে চলাচলে আতঙ্ক বোধ করেন।
যাত্রীরা বলছেন, সকাল-বিকেল প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। যত্রতত্র পথচারী পারাপার ও অবৈধ অটোরিকশার চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। স্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা বা নজরদারিরও অভাব রয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। পরে কয়েক দফায় ব্যয় বাড়িয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। যদিও প্রকল্পের ৩ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রকল্পের ঠিকাদার কাজ ছেড়ে চলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাকি কাজ শেষ করতে আরও প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হলেও তা নাকচ করে পরিকল্পনা কমিশন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর প্রকল্পে আর কোনো কাজ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। একনেকের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে গত বছরের আগস্টে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি রিভিউ কমিটি একই ধরনের মত দেয়।
এসব কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে করিডোরটি বিআরটি ব্যবস্থার বদলে সব ধরনের যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আর নির্মাণ ব্যয় তুলে আনতে যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হবে। ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রকল্পটি মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

বিআরটি হলো বাসের জন্য বিশেষ লেনভিত্তিক ব্যবস্থা, যা মেট্রোরেলের মতো যানজটহীন যাতায়াত সুবিধা দেয়। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের মধ্যে বিআরটি গড়ে তুলতে ২০১২ সালে প্রকল্পটি নেয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু নকশাগত জটিলতার কারণে এখন এটি বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিআরটি করিডোরে নকশাগত ত্রুটির জন্য প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দায়ী করে জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে রিভিউ কমিটি।
প্রকল্পটির মূল অবকাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বলেন, সরকারের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকল্পটির পরামর্শক হিসেবে ছিল অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনাল ও ব্রিসবেন সিটি এন্টারপ্রাইজ, ফ্রান্সের সিস্ট্রা এসএ এবং বাংলাদেশের এসিই কনসালট্যান্স লিমিটেড। আর বিআরটি করিডোর পরিচালনা ও ব্যবসায়িক মডেল তৈরির দায়িত্ব পেয়েছিল ভারতের সিইপিটি ইউনিভার্সিটি ও বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন। পরে অবশ্য তারা প্রকল্প থেকে সরে আসে।
প্রকল্পটির শুরু থেকেই পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন যোগাযোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের বিলম্ব, পরিকল্পনার ত্রুটি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে তাঁর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

শামসুল হক বলেন, ‘বিআরটি প্রকল্প নিয়ে আর সামনে এগোনো উচিত হবে না। আগে অডিট করে দেখতে হবে চুক্তি অনুযায়ী কতটুকু কাজ বাকি আছে। এরপর চুক্তি থেকে বের হয়ে এসে করিডোরটিকে নতুনভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে হবে।’
তিনি আরও জানান, বিআরটি করিডোরকে টোলভিত্তিক উচ্চগতির সড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা, দুই পাশে সার্ভিস রোড নির্মাণ, স্টেশনগুলো সিলগালা করা এবং টঙ্গীতে টোলপ্লাজা নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ কিলোমিটার করিডোরের অনেক অংশ, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল এলাকা, বিআরটি ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত নয়। অনেক জায়গায় সার্ভিস রোড ও ফুটপাত নেই। সড়কের মাঝখানে মাত্র দুটি লেন থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচলেও বাধা তৈরি হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গভাবে বিআরটি চালু হলে ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলমুখী যান চলাচলে বড় ধরনের যানজট তৈরি হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকার চাইলে বিআরটি লেন ব্যবহারের জন্য টোল আদায় করতে পারে এবং এটিকে দ্রুতগতির সড়ক হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধেও সহায়তা মিলবে। টঙ্গী ওভারপাস এলাকায় টোল প্লাজা নির্মাণ এবং বিদ্যমান বিআরটি স্টেশনগুলো সংস্কার করে টোল আদায়ের কাজে ব্যবহারেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকেই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
এদিকে বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত কোম্পানির কর্মীদের সরকারের অন্য বিভাগে সমন্বয় করারও সুপারিশ করা হয়েছে।








