মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জীবননাশের হুমকির অভিযোগে এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। গত বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তার দেয়া একটি ছবিকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ এপ্রিল) সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ওই ছবিতে দেখা যায়, ঝিনুকের খোলস দিয়ে ‘৮৬’ ও ‘৪৭’ সংখ্যা দুটি তৈরি করা হয়েছে। ইংরেজি ভাষার চলিত কথায় ‘এইটি-সিক্স’ (৮৬) শব্দটি ‘অপসারণ করা’ বা ‘সরিয়ে দেয়া’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আর ‘৪৭’ দিয়ে ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কোমি অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি জানতেন না ওই ছবির সংখ্যাগুলোর কী অর্থ। কিন্তু ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘পোস্টটি ছিল ৪৭তম প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি।’
এই অভিযোগের জবাবে কোমি বলেন, ‘আমি এখনো নির্দোষ, আমি এখনো ভীত নই এবং আমি এখনো স্বাধীন ফেডারেল বিচার বিভাগে বিশ্বাসী।’
এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল বলেন, ‘সংস্থাটির সাবেক পরিচালক হিসেবে কোমি ভালোভাবেই জানতেন এমন একটি পোস্ট করার ফলে কী ধরনের মনোযোগ ও পরিণতি ডেকে আনা হবে।’ প্যাটেল আরও বলেন, ‘জেমস কোমি লজ্জাজনকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জীবনের ওপর হুমকিকে উৎসাহিত করেছেন এবং তা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে পুরো বিশ্বকে দেখিয়েছেন।’
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের তদন্ত শুরু করার পর কোমিকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকে ট্রাম্প বারবার কোমির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলে আসছেন। এই অভিযোগ হলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা।
কোমি বলেন, ‘ঠিক আছে, তারা আবার ফিরে এসেছে। এবার এক বছর আগে নর্থ ক্যারোলাইনার একটি সমুদ্রসৈকতে ঝিনুকের খোলস দিয়ে তোলা একটি ছবি নিয়ে। এটিই শেষ হবে না, কিন্তু আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জীবনের হুমকি দেয়া আমাদের দেশের আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। গ্র্যান্ড জুরি একটি অভিযোগপত্র জারি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে জেমস কোমি ঠিক তাই করেছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের গোয়েন্দারা গত মে মাসে ঝিনুকের খোলস সংক্রান্ত ছবিটি নিয়ে কোমিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে কোমি ইনস্টাগ্রাম পোস্টটি মুছে ফেলেন এবং একটি অনুসরণকারী বার্তায় বলেন, ‘তিনি ধরে নিয়েছিলেন ওই ঝিনুকের খোলসগুলো একটি রাজনৈতিক বার্তা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বুঝতে পারিনি কিছু মানুষ ওই সংখ্যাগুলোর সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক খুঁজে পাবে। এটি আমার কখনোই মাথায় আসেনি, কিন্তু আমি যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরোধী, তাই আমি পোস্টটি সরিয়ে ফেলি।’
ট্রাম্প কোমির ওই পোস্ট সম্পর্কে বলেন, ‘একটি শিশুও জানে এর কী অর্থ।’
কিছু আইনি বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলেছেন, ‘অভিযোগপত্রটি দুর্বল এবং এটি ডিওজে-র পক্ষ থেকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লক্ষ্য করার প্রচেষ্টা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।’ ইউএনসি স্কুল অব ল-এর সাংবিধানিক আইনের বিশেষজ্ঞ মাইকেল গেরহার্ডট বলেন,‘কোমির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টটিকে আদালত সম্ভবত প্রথম সংশোধনীর আওতায় সুরক্ষিত মুক্ত বক্তব্য হিসেবেই দেখবে।
সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে নিযুক্ত সাবেক সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল জিমি গুরুলে বলেন, ‘নতুন এই অভিযোগ মার্কিন ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি লজ্জা।’ বর্তমানে নটর ডেম ল’ স্কুলের অধ্যাপক গুরুলে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ডিওজে প্রমাণ করতে পারবে না যে জেমস কোমির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হুমকি দেয়া বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্য ছিল। এই অভিযোগপত্র হলো প্রেসিডেন্টের একজন রাজনৈতিক শত্রুকে ভীতি দেখানোর একটি স্বচ্ছ প্রচেষ্টা।’
এটি বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে কোমির বিরুদ্ধে আনা দ্বিতীয় অভিযোগ। গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি কোমির বিরুদ্ধে ২০০ সালের সেপ্টেম্বরে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেয়ার সময় মিথ্যা কথা বলা এবং কংগ্রেসের কার্যধারা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ আনে। ট্রাম্প দেশের শীর্ষ আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কোমিসহ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক তদন্ত চালানোর আহ্বান জানানোর কয়েক দিন পর এই অভিযোগ আসে।
অক্টোবরে আদালতে একটি সংক্ষিপ্ত হাজিরার সময় কোমি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। এরপর নভেম্বরে মামলাটি খারিজ করে দেয়া হয়। মার্কিন জেলা বিচারক ক্যামেরন কারি প্রসিকিউটর লিন্ডসে হ্যালিগানের ‘অবৈধ’ নিয়োগের কারণে কোমির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রটি বাতিল করে দেন। বিচারক বলেন, ‘ইস্টার্ন ভার্জিনিয়ার প্রসিকিউটর হ্যালিগান গ্র্যান্ড জুরির কাছে অভিযোগ উপস্থাপনের জন্য অনুমোদিত ছিলেন না। হ্যালিগান হলেন সাবেক হোয়াইট হাউজের সহযোগী, যার আগে কোনো মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না।’ তবে বিচারক সরকারের পক্ষ থেকে আবার চেষ্টা করার পথ উন্মুক্ত রেখেছেন।
এদিকে মঙ্গলবার সকালে একটি পৃথক আদালত রায় দেয় যে, সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর মরিন কোমি—জেমস কোমির কন্যা—ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে বরখাস্ত করার বিরুদ্ধে তার মামলাটি এগিয়ে নিতে পারবেন।








