সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ঋতুরঙ্গময়ী রূপসী বাংলা। ষড়ঝতুর বৈচিত্র এদেশের প্রকৃতিকে সাজিয়েছে নয়ন-লোভন অনুপম লাবণ্য| এক এক ঋতুতে বাংলার প্রকৃতি সেজে ওঠে নব নব সাজে। উদার প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে অকাতরে। অসংখ্য দৃষ্টি নন্দন পাহাড়-পর্বত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, সবুজ অরণ্য, সমুদ্র, নদ-নদী, সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটককে আকর্ষণ করে গভীরভাবে। এই অনুপম রূপলাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে বিদেশি পর্যটকগণ যেন আনমনে বলে ওঠেন,
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর।
আবার স্বদেশের রূপমুদ্ধ পর্যটকগণ বিশ্বকবির কণ্ঠে কণ্ঠে মিলিয়ে বলে ওঠেন-
বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু,
দেখা হয় নাই চক্ষু মিলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।
দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র এ বাংলাদেশে রয়েছে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর দীর্ঘতম বালুকাময় অখণ্ড সৈকত। রয়েছে নয়নাভিরাম প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। রয়েছে পৃথিবীর অনন্য ঐতিহ্য অঞ্চল। ৬,৫১৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন পর্যটকদের আকর্ষণ করে চিত্রা হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, বানর, হনুমান সুন্দরী বৃক্ষ, গরানের কারণে।
এছাড়া বিপুল সম্ভার দিয়ে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দেশি-বিদেশি পর্যটককেও আকর্ষণ করে। তার অপূর্ব পতেঙ্গা সৈকত, বায়োজিদ বোস্তামীর মাজার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ওয়ার সিমেট্রি , ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার জালালাবাদ পাহাড়, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, অপূর্ব রূপ লাবণ্যে ভরা কাপ্তাই লেক, ঐতিহ্যবাহী সিআরবি পাহাড়, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ইত্যাদি নয়ন জুড়ানো অবকাঠামো পর্যটকদের বারবার ফিরিয়ে আনে।
দৃষ্টিনন্দন অপূর্ব পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র-সৈকত এবং নদ-নদী সমৃদ্ধ অপরূপ প্রকৃতি প্রাচ্যের রাণী নামে পরিচিত চট্টগ্রামকে পর্যটনের অপূর্ব স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালি অতিথিপরায়ণ এবং পর্যটকবান্ধব। অপরূপ প্রাকৃতিক শোভাসমৃদ্ধ বাংলাদেশের ইকো ট্যুরিজম, কোস্টাল ট্যুরিজম এবং আন্ডারওয়াটার ট্যুরিজম অমিত সন্তাবনাময় পর্যটন শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে। গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা এবং স্মার্ট বাংলাদেশে রুপান্তরিত করবে- এ প্রতীক্ষা সবার।
প্রধানমন্ত্রী এ পর্যটন শিল্পের প্রসারের কথা ভেবে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছেন। চট্টগ্রাম মেরিন ড্রাইভসহ কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ, বঙ্গবন্ধু টানেল, চার লেইন সড়ক, ফ্লাইওভার, আধুনিক সুযোগ সুবিধাসমৃদ্ধ কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, পর্যটন-শিল্পের অপার সন্তাবনা সমৃদ্ধ রাঙ্গামাটি – খাগড়াছড়ির যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পর্যটন বান্ধব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হোটেল-মোটেল নির্মাণ পর্যটন শিল্পকে প্রসারিত করে। পাশাপাশি এদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখছে।
আশাব্যঞ্জক খবর হচ্ছে, বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ প্রতিবছর পর্যটক হিসেবে ঘুরে বেড়ান। এরইমধ্যে ৭৫ শতাংশ ভ্রমণ করেন এশিয়া মহাদেশ। তাই পর্যটন শিল্পকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করতে পারলে এই শিল্প থেকে কর্মসংস্থান হবে ২.৭ শতাংশ।
ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশ হতে পারে যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু এবং পর্যটনের অনন্য স্থান। এ আশা-জাগানিয়া কথামালা উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনা। তার মত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন অনন্য দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে হৃদয়ঙ্গম করেছেন যে, শুধু পোশাক শিল্প, কৃষি, রেমিটেন্স ইত্যাদি দিয়ে দেশকে ২০৪১ এর মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যবসা-বাণিজ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার। পর্যটকদের ভ্রমণ অবাধ, নিরাপদ ও আনন্দদায়ক করার জন্য টুরিস্ট পুলিশ গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ তাদের জীবন জীবিকার জন্য পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই পর্যটনবান্ধব ইকোট্যুরিজম এবং আন্ডারওয়াটার ট্যুরিজমকে আরও জনপ্রিয় করতে হবে। শেখ হাসিনা খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেছেন মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড যদি পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে এত দেশি-বিদেশি মুদ্রা আয় করতে পারে, তবে এত প্রাকৃতিক বৈভব সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পারবে না কেনো? এ সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবলিক- প্রাইভেট পার্টনারশিপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের বৈচিত্রময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভূপৃষ্ট থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতার নীলগিরি , নীলাচল, ১৮০০ ফুট উচ্চতার সাজেক ভ্যালি, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অখণ্ড বালুকাময় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, বিচিত্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং আধুনিক বিনোদনের ব্যবস্থাসম্পন্ন হোটেল, মোটেল নির্মাণ, আধুনিক বিমানবন্দর, সড়ক, রেল ও নদীপথে যোগাযোগ স্থাপন জরুরিভাবে বাংলাদেশে সম্পন্ন হচ্ছে। পদ্মা সেতু এবং তার ওপরে রেলযোগাযোগ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করবে প্রবলভাবে। এতে বিকশিত হবে পর্যটন শিল্প, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান, দূর হবে বেকারত্ব।

কৃষি বিপ্লব, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, পোশাক শিল্পে শীর্ষস্থান, কোভিড -১৯ এর প্রাক্কালে পর্যটন শিল্পের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অতএব আমরা এক অনাবিল আনন্দে উদ্বেলিত হতে পারি।
প্রিয় স্বদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম তার রূপ মাধুরী দিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে দারুণভাবে। বর্তমান সরকারের পর্যটনবান্ধব নীতি অনুসরণ করে, নিরাপদ ও দ্রুতগতির যাতায়াত নিশ্চিত করে ট্যুরিজম রিকভারি প্ল্যান অনুযায়ী ২০টি গাইডলাইন পর্যটন শিল্লের সাথে জড়িত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে বিশাল সন্তাবনা এবং গতির সৃষ্টি করেছে পর্যটন শিল্পে।
আমরা আশা করি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ধর্মীয় সংস্কৃতি, কৃষ্টি কালচার, রীতিনীতি বজায় রেখে আলাদা পর্যটন অঞ্চল সৃষ্টি করে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারি ব্যাপকভাবে। সাথে সাথে দেশি পর্যটকদের জন্য সুলভ মূল্যে নিরাপদে ভ্রমণ করা, থাকা-খাওয়া এবং আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমরা পর্যটন শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারি যা প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করতে পারে।
গণমাধ্যম, বিদেশি দূতাবাস এবং দেশপ্রেমিক প্রবাসীরা পর্যটন শিল্পকে প্রসারিত করার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের গৌরব গাথা, ইতিহাস, অর্জন বিশ্বের বুকে উজ্জল ভাবে তুলে ধরা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর-নগর গ্রামগঞ্জ সৃষ্টি করে, নিরাপদ পরিবহন, হোটেল, এয়ারলাইন ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করে দেশ বিদেশের পর্যটকদের আমরা চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে আমন্ত্রণ জানাতে পারি। এই পর্যটন শিল্প থেকে যে রাজস্ব আদায় হবে সেটা অনেক বড় শিল্প থেকে পাওয়ার রাজস্ব থেকে অনেক বেশি হবে।
সুনীল অর্থনীতি, বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির নীচে আন্ডারওয়াটার ট্যুরিজম বাংলাদেশকে বদলে দিতে পারে অভিনবরূপে। হলি আটিজানের মত ট্র্যাজেডি বা জঙ্গিবাদেরমত জঘন্য ঘটনা যেন শহীদের পবিত্র রক্তে স্নাত এ দেশে আর না ঘটে, সে ব্যাপারে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে শেখ হাসিনা সরকার। দলমত নির্বিশেষে সব দেশপ্রেমিক মানুষকে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তে ভেজা এবং দুই লক্ষ মা -বোনের সর্বোচ্চ ত্যাগের নির্যাসে সিক্ত লাল-সবুজের পতাকার মান রক্ষা করার জন্য এ প্রিয় মাতৃভূমিকে বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরতে হবে পর্যটনসহ অন্যসব সম্ভাবনাময় শিল্পকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করে। এ এগিয়ে যাবার মিছিলে পর্যটনের অপার সন্তাবনা নিয়ে প্রাচ্যের রাণী চট্টগ্রাম থাকবে সর্বাগ্রে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








