ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) শুরু হয়েছে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনব্যাপী বৈঠক। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে থাকায় এবং ইরান যুদ্ধ ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করায় বৈঠকটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
ব্রিকস হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট, যার লক্ষ্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতিতে সমন্বয় গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দাবি জোরালো করা।
ব্রিকস নামটি এসেছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজি নামের প্রথম অক্ষর থেকে। শুরুতে ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ‘ব্রিক’ নামে এই জোটের যাত্রা শুরু হয়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে এর নাম হয় ‘ব্রিকস’।
২০২৩ সালে সদস্যপদের আবেদন করার পর মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সৌদি আরব এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিলেও বাকি দেশগুলো সদস্য হয়েছে। একই সময়ে আর্জেন্টিনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হওয়ায় সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়াও ব্রিকসে যোগ দেয়।
কোথায় ও কখন হচ্ছে বৈঠক?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই বৈঠক।
বৈঠকের অধিকাংশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কাছাকাছি অবস্থিত ভারত মণ্ডপম কনভেনশন সেন্টারে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নৈশভোজের আয়োজনও রয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে) আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী নেতাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
কারা অংশ নিচ্ছেন?
বৈঠকে ব্রিকসভুক্ত ও অংশীদার দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নিচ্ছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, দক্ষিণ আফ্রিকার রোনাল্ড লামোলা এবং ব্রাজিলের মাউরো ভিয়েরা ইতোমধ্যে উপস্থিত হয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কারণে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন না। তার পরিবর্তে ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং চীনের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও দিল্লিতে পৌঁছেছেন। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনোও বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।
আলোচ্যসূচিতে কী থাকছে?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের বৈঠকের প্রতিপাদ্য হচ্ছে— স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন গড়ে তোলা।
স্বাস্থ্য খাতের সহযোগিতা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে সমন্বিত অবস্থান গঠনের বিষয়গুলো আলোচনায় থাকছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চলমান ইরান যুদ্ধই বৈঠকের মূল আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক রাফায়েল লস বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু ব্রিকস বৈঠকেই নয়, ট্রাম্প-শি বৈঠকেও পড়বে।
বৃহস্পতিবার যুদ্ধ ৭৬তম দিনে গড়িয়েছে। কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চললেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
ইরান-আমিরাত উত্তেজনাও আলোচনায়
চলতি বছরের এপ্রিলে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। কারণ, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।
এরপর থেকে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তেহরানের বক্তব্যে ক্রমেই আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
এছাড়া গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়েও ব্রিকসের অভ্যন্তরে মতভেদ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সম্প্রতি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হওয়ায় জোটের অভিন্ন অবস্থান গঠন কঠিন হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের প্রভাব
বুধবার সন্ধ্যায় চীনে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং–এর সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ইরানকে চাপ দিতে চীনের সহযোগিতা চাইতে পারেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলমান নৌ উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকট নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
রাফায়েল লসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমেয়াদি কৌশল এবং প্রচলিত মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের অনাগ্রহের সুযোগ নিয়ে চীন ইরান ইস্যুতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক?
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান সেখানে জাহাজ চলাচলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এতে ভারত ও চীনের মতো তেলনির্ভর দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানিও চাপে পড়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিল, মিসর ও দক্ষিণ আফ্রিকাও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মতপার্থক্যের কারণে এবারের ব্রিকস বৈঠক থেকেও শক্ত কোনো যৌথ বিবৃতি নাও আসতে পারে। তবে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পশ্চিমা প্রভাব মোকাবিলায় এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।








