দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম ও নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটি ভালো সময়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি)। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদ বিদায় নেওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ আশার আলো দেখছে। গত ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের পর জাতীয় রাজনীতিতে এখন তরুণদের মধ্যেই ভবিষ্যৎ দেখছে বিএনপি। কারণ গণতন্ত্র ও জনগনের অধিকারের এ লড়াইয়ে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরা।
ছাত্র-জনতা কাঁধে কাঁধ রেখে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, যারা রসদ যুগিয়েছেন তাদের সিংহভাগই জাতীয়তাবাদী শক্তির এ তরুণ নেতৃত্ব। তবে পরিবর্তনের এ পথ এত সংক্ষিপ্ত ছিল না। এর পেছেনেও রয়েছে দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলন সংগ্রামের প্রেক্ষাপট।
বিষয়টি এক দশক আগেই অনুধাবন করেছিলেন বিএনপির আগামী দিনের কান্ডারি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আন্দোলন পরিচালনায় প্রথম থেকেই তিনি আস্থা রেখেছেন তরুণ প্রজন্মের ওপর। বর্তমান বাস্তবতা ও বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ মাথায় রেখে অপেক্ষাকৃত তরুণদের নেতৃত্বে আনতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন তিনি। সুদুর লন্ডনে নির্বাসিত থেকেই তরুণদের পুনর্জাগরণের চেষ্টা চালান তিনি।
তরুণদের মেধা শ্রমকে ব্যবহার করে সরকার বিরোধী আন্দোলনের শক্তিশালী ভিত রচনা করেছেন। যে কারণে শত নির্যাতন, মামলা হামলা করেও জাতীয়তাবাদি শক্তিকে দমন করা যায়নি। তারেক রহমান প্রথমেই টার্গেট করেন বিএনপির প্রবীণ নেতা, জনপ্রিয় এমপি মন্ত্রীদের সন্তানদের। যাতে জনপ্রিয় নেতাদের পরেও বিএনপির ঝান্ডা তুলে নিতে পারেন তাদের উত্তরসূরীরা। তারেক রহমানের এ কৌশল শতভাগ সফল হয়েছে এ কথা এখন বলাই যায়। কারণ বিএনপির এসব তরুণ নেতারা নিজেদের মেধা, পরিশ্রম ও ত্যাগ দিয়ে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করেছে।
উল্লেখ করার মতো বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কেএম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকার মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল, অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে খন্দকার মারুফ হোসেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত হান্নান শাহর ছেলে রিয়াজুল হান্নান, রাজশাহীতে সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কবির হোসেনের ছেলে নাসির হোসেন অস্থির, চট্টগ্রামে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর নাছিরের ছেলে মীর হেলাল, ঢাকায় সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে তানভীর আহমেদ রবিন, এসএ খালেকের ছেলে এসএ সিদ্দিক সাজু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সন্তান বিএনপির পররাষ্ট্র কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু মাহমুদ চৌধুরী অন্যতম।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সামনে জাতীয় কাউন্সিল করারও পরিকল্পনা করছে বিএনপি। সেখানে জাতীয় ও তৃণমুলে কমিটি করার ক্ষেত্রেও এইসব তরুণ নেতাদের প্রাধাণ্য থাকবে বলেই মনে করেন বিএনপির নীতি নির্ধারকরা। এমনকি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই সকল তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রয়েছে দলের হাইকমান্ডের।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে তরুণ নেতাদের প্রায় সকলেই নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় সময় দিচ্ছে। জনগনের কাছে যাচ্ছেন। দলটির আশা আগামী সংসদ নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব ভালো ও দক্ষতার সঙ্গে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় রাজশাহীতে মাঠ-ঘাট ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রয়াত ভূমি প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কবির হোসেনের ছেলে নাসির হোসেন অস্থির। রাজশাহীর চারটি আসন থেকেই অপ্রতিদ্বন্দী ছিলেন কবির হোসেন। তার মৃত্যুর পর হাল ধরেছেন অস্থির। বিগত সময়ে সব আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশ ছিল তার। বিশেষ করে নির্বাচনী এলাকা পবা মোহনপুরবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভরসার কেন্দ্রস্থল নাসির হোসেন অস্থির।
ঢাকায় বিএনপির আলোচিত তরুণ নেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দীতা করতে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় তাকে। ব্যাপক কারচুপির কারণে ওই নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে না পারলেও জনতার মেয়র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন ইশরাক।
খুলনায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই প্রভাবশালী নেতা ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম। তার প্রয়াণের পর তরিকুল পরিবারের প্রভাবে কোন ভাটা পড়েনি কারণ বাবার রাজনীতির হাল ধরেন ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বর্তমানে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় রাজনীতিতেও তার রয়েছে বলিষ্ঠ পদচারণা।
বিএনপির এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কেএম ওবায়দুর রহমান। তিনি গত হওয়ার পর দলের হাইকমান্ডের আগ্রহে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তার মেয়ে শামা ওবায়েদ। ফরিদপুরে নিজের নির্বাচনী এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরীসহ জাতীয় রাজনীতিতেও সরব শামা। ফরিদপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছেন শামা।
চট্টগ্রামেও বিএনপির তরুণ নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে চমক দেখাচ্ছেন প্রবীণ নেতা মীর নাসিরের সন্তান মীর হেলাল। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, মিডিয়া সেলের সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্য, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবে নানামুখী কার্যক্রমে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএিনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি তত্বাবধান করছেন এই সকল তরুণ নেতাদের। বিশেষ করে গত এক দশকে দলের বিভিন্ন সংকটকালীন সময়েও তিনি কৌশল অবলম্বন করে বিএনপির প্রভাবশীলী পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মকে রাজনীতিতে এগিয়ে এনেছেন। তাদেরকে নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেছেন তারেক রহমান।
এব্যাপারে প্রায়াত ভূমি প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কবির হোসেনের ছেলে নাসির হোসেন চ্যানেল আইকে জানান, আমরা বিএনপি পরিবারের সন্তান। নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগনের ওপর আমাদের দায়িত্ব অনেক। আমরা যদি তাদের না দেখি, তাহলে কে দেখবে? তাই চাইলেও এই দায় থেকে এড়ানো যায় না। বিশেষ করে আন্দোলন সংগ্রামে আহত হওয়া বা জেল জুলুমসহ যেকোন সংকটে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সহযোগিতা করা, নেতাকর্মীদের বাসায় গিয়ে বাজার পৌঁছে দেওয়াসহ, মামলা ও চিকিৎসা ব্যয়বহনসহ নানা সামাজিক কাজে নিয়োজিত রেখেছিলাম। তারেক রহমানের নির্দেশেই কখনো সরবে কখনো নিরবে এসব দায়িত্বগুলো পালন করে গেছি।
বাবার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করা ও যে সকল উন্নয়ন করে গেছেন সে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান তিনি। বিভিন্ন সময় মানবিক উদ্যোগ নিয়ে জাতীয়ভাবেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন নাসির হোসেন অস্থির।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, তরুণদের মধ্যে ইতোমধ্যে অনেকেই দক্ষতা, যোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এ কারণে তাদের সুযোগটা বাড়ানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, যারা প্রবীণ আছেন, দলে অনেক ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে তরুণদের এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে তাদের সার্ভিসটা পাওয়া যায়। অপেক্ষাকৃত তরুণরা বেশি পরিশ্রম করতে পারবেন এ কারণেই তাদের নিয়ে আসা হচ্ছে। যারা ইতোমধ্যে সব দিক থেকে যেমন আন্দোলন-সংগ্রামেও আছে, নীতি-নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন-এসব বিবেচনা করেই তারা নেতৃত্বে আসছেন। সামনেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।








