বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরোনো সত্য হলো, যে দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে, সে শুধু ভোটের সমীকরণ নয় প্রশাসনিক সমীকরণও গড়ে তোলে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকারগুলো সাধারণত দুই স্তরে কাজ করে- একদিকে প্রশাসনিক কাঠামোকে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা দিয়ে স্থিতিশীল রাখা, অন্যদিকে জনগণের নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, ভর্তুকি, কার্ডভিত্তিক সহায়তা বা বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্ত রাখা। বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পদোন্নতি, সরকারি সুবিধা সম্প্রসারণ যেমন আমলাতন্ত্রকে সন্তুষ্ট রাখে, তেমনি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ভোটভিত্তি দৃঢ় করে। এভাবে প্রশাসনিক আনুগত্য ও জনসমর্থন- দুইয়ের ভারসাম্যেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতি গড়ে ওঠে।
প্রশাসনিক সুবিধা ও ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া
দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, পদোন্নতি, গাড়ি ও গৃহঋণসহ নানা সুবিধা বাড়িয়েছিল। ২০১৫ সালের নতুন পে-স্কেল, পরবর্তী সময়ে সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ, সরকারি অর্থায়নে বিদেশ প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন ক্যাডারে দ্রুত পদোন্নতি এসব মিলিয়ে প্রশাসনের একটি বড় অংশ নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও সুবিধাপ্রাপ্ত মনে করেছিল। সমালোচকেরা তখনই বলেছিলেন, এই আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার এক ধরনের অঘোষিত ভিত্তি হয়ে উঠেছিল।
এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের আন্দোলনের পরে ৫ আগস্ট এবং অন্তবর্তী সরকারের শাসনের পরে ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ইরান-আমেরিকা সংঘাত ঘিরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম, এলপিজি, পরিবহন ব্যয় সবখানেই চাপ। নতুন সরকার যখন প্রশাসনিক রদবদল, নীতিগত পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক সমীকরণ সামলাতে ব্যস্ত, তখনই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তাদের সামনে আচমকা এক বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
এছাড়া হামের মতো রোগে শিশু মৃত্যু জনমনে ক্ষোভের তৈরি করেছে। বিগত সরকারগুলোর অপরিকল্পিত স্বাস্থ্যনীতির কারণে সৃষ্ট অবস্থার নেতিবাচক পরিস্থিতি পুরোটাই এসে পড়েছে বিএনপি সরকারের উপরে।
ব্যয় সংকোচন নীতি বনাম প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া
এই ধাক্কার মধ্যেই গত ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে পরিচালন ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আনুষ্ঠানিক পরিপত্র জারি করে সব সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায়। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে ৯টি ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানো, সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ স্থগিত, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ হ্রাস, সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন ও সম্মেলন ব্যয় কমানো, ভ্রমণ ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানো, নতুন যানবাহন ও কম্পিউটার ক্রয় বন্ধ, অফিসে জ্বালানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস ব্যবহার কমানো এবং ভূমি অধিগ্রহণ স্থগিত- সব মিলিয়ে এটি স্পষ্ট ব্যয় সংকোচন নীতি। এছাড়া নতুন পে স্কেল ঘোষণার দাবি নিয়েও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপ রয়েছে আগে থেকেই।

অর্থনীতির যুক্তিতে সংকটকালে এমন সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন হলো, এর প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়বে। প্রশাসন, পুলিশ এমনকি সামরিক কাঠামোর মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে যে সুবিধাভিত্তিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল সেখানে হঠাৎ করে লাগাম টানা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যারা ঋণ, প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য সুবিধার প্রত্যাশায় ছিলেন তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে।
জনমুখী উদ্যোগের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বক্তব্য ও আস্থা
তবে একই সময়ে সরকার কিছু দৃশ্যমান ইতিবাচক উদ্যোগও নিয়েছে। মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-পুরোহিত কার্ড চালুর উদ্যোগ, প্রধানমন্ত্রী নিজে নিয়মিত যাতায়াতে ভিআইপি প্রটোকল ব্যবহার না করে যানজট কমানোর বার্তা দেওয়া, খেলোয়াড়দের ভাতা পুনর্বিন্যাস, সরকারি হাসপাতালগুলোতে মন্ত্রী-এমপিদের সরাসরি নজরদারি বাড়ানো- এসব পদক্ষেপ জনমনে একটি সংস্কারধর্মী ইমেজ তৈরি করেছে। অর্থাৎ একদিকে ব্যয় সংকোচন, অন্যদিকে লক্ষ্যভিত্তিক জনবান্ধব কর্মসূচি, সরকার দুই দিকেই বার্তা দিতে চাচ্ছে।

তবু সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা। ঈদের আগে সড়ক পরিবহন খাতে চাঁদা ও বাসভাড়া নিয়ে মন্ত্রীর অতিকথন জনমনে প্রশ্ন তুলেছে, সরকার কি বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে উপলব্ধি করছে। একইভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পাম্পে তেল মজুত আছে, সংকট নেই – এমন বক্তব্য তখনই এসেছে যখন সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি নিচ্ছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সরকারি ভাষ্যের মধ্যে ফারাক তৈরি হলে সেটি দ্রুত আস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।
এছাড়া পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। যাদের দৈনিক আয়ের ওপরই সংসার নির্ভর করে, তাদের বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া সরিয়ে দিলে তা সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের হতাশা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশাসনিক সমন্বয়ের জটিল বাস্তবতা
আরেকটি জটিল বাস্তবতা হলো প্রশাসনের ভেতরের আদর্শিক ও নেটওয়ার্কভিত্তিক উপস্থিতি। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের নানা স্তরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-ঘনিষ্ঠ বা তাদের পটভূমি থেকে উঠে আসা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। এটি সরাসরি অভিযোগের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের ফল হিসেবে একটি আলোচিত বাস্তবতা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও জামায়াতের সম্পর্ক অতীতে জোটগত সহযোগিতা ও দূরত্ব- দুই অভিজ্ঞতাই দেখেছে। এছাড়া বহুবছর ধরে থাকা আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ট প্রশাসনতো আছেই, যদিও তারা ড. ইউনূস সরকারের স্বল্পকালীন সময়ে অনেকটাই কোনঠাসা ছিল। ফলে তারেক রহমানের সরকারের প্রশাসনিক সমন্বয় কতটা নির্বিঘ্ন থাকবে, সেটি একটি কৌশলগত প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ তিনটি– প্রশাসনিক আস্থা ধরে রাখা, জনআস্থা রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা। শুধু ব্যয় কমানো বা শুধু জনবান্ধব কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। এই দুইয়ের ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক বার্তার সামঞ্জস্যই নির্ধারণ করবে তাদের শাসনের প্রথম অধ্যায়ের সুর।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








