লুইজিয়ানা টেক-এ ‘আর্লি ক্যারিয়ার এক্সিলেন্স ইন স্কলারশিপ’ পেলেন বাংলাদেশি শিক্ষক ড. নাসিম সাবাহ

Louisiana Tech University’s Division of Research hosted the Research and Scholarship Awards on April 9, 2026. These awards are given to Louisiana Tech faculty who drive innovation through research and practice, leading to discoveries that expand the boundaries of knowledge. Photograph by Emerald McIntyre/Louisiana Tech University
কুমিল্লার সাধারণ এক কিশোরের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ডানা মেলেছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) করিডোরে। কিন্তু সেই স্বপ্ন কেবল সার্কিট আর ইলেকট্রনিক্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গাণিতিক বিশ্লেষণ আর মেধার জোরে তিনি আজ যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটির একজন কৃতি অধ্যাপক। তিনি ড. নাসিম সাবাহ—যাঁর জীবনগল্প প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে সাহসী সিদ্ধান্ত আর কঠোর পরিশ্রম কীভাবে একজন মানুষকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের কুমিল্লা থেকে শুরু হয়ে স্পেন, টেক্সাস, ম্যাসাচুসেটস হয়ে আজ লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটিতে—ড. নাসিম সাবাহর পথচলা নিছক সাফল্যের গল্প নয়; এটি আত্ম-অন্বেষণ, অধ্যবসায়, মেধা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ফাইন্যান্সে, কর্পোরেট পেশাজীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায়—তাঁর জীবনপথ দেখায়, মানুষের গন্তব্য সব সময় শুরুতেই নির্ধারিত থাকে না; অনেক সময় সেই গন্তব্য আবিষ্কৃত হয় পথ চলার মধ্যেই।
বর্তমানে ড. সাবাহ লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটির কলেজ অব বিজনেসে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর অব ফাইন্যান্স এবং চেজ ব্যাংক এনডাউড প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন। আগামী আগস্টে তিনি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পদে উন্নীত হবেন। সম্প্রতি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্লি ক্যারিয়ার এক্সিলেন্স ইন স্কলারশিপ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন—যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত নির্বাচিত ও মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি।
ড. সাবাহর শিক্ষাজীবনের শুরু কুমিল্লায়। তিনি পড়াশোনা করেছেন কুমিল্লা জিলা স্কুল এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। এরপর ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে, বুয়েটে, যেখানে তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এই শিক্ষাগত ভিত্তি ছিল কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তখনও হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না, তাঁর প্রকৃত পেশাগত পরিচয় গড়ে উঠবে অন্য এক জগতে—ফাইন্যান্সে।

বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি গ্রামীণফোন লিমিটেডে কর্মজীবন শুরু করেন। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হন। জীবনের এই পর্বটিই ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের সময়। কর্পোরেট জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ব্যবসায় শিক্ষার গভীরতর পরিচয় তাঁকে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করায় যে তাঁর প্রকৃত আগ্রহ ব্যবসা ও ফাইন্যান্সে। সেই উপলব্ধি ছিল কেবল বিষয়বদল নয়; ছিল নিজের ভেতরের বৌদ্ধিক পরিচয়কে নতুন করে চিনে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।
এমবিএ অধ্যয়নের সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে ব্যবসায় উচ্চশিক্ষাই হবে তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য। ফাইন্যান্স ও অর্থনীতিতে ইউরোপের একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করে তিনি বেশ কয়েকটি অফার পান। শেষ পর্যন্ত তিনি স্পেনের বার্সেলোনা স্কুল অব ইকোনমিক্সকে বেছে নেন, যেখানে তিনি পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ফাইন্যান্সে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনে আরেকটি মৌলিক পরিবর্তন আনে। শুরুতে শিক্ষক হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তাঁর ছিল না, কিন্তু বার্সেলোনার সেই একাডেমিক পরিবেশ তাঁর ভেতরে গবেষণা ও শিক্ষকতার প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি করে। সেখানেই জন্ম নেয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন।
মাস্টার্স শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটিতে ফাইন্যান্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন ২০১৯ সালে। পিএইচডির পর তিনি ম্যাসাচুসেটসের ফ্রেমিংহ্যাম স্টেট ইউনিভার্সিটিতে টেনিউর-ট্র্যাক অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। সেখানে দুই বছরের কিছু বেশি সময় অধ্যাপনা করার পর ২০২১ সালে তিনি লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। ২০২২ সালে তিনি চেজ ব্যাংক এনডাউড প্রফেসরশিপ লাভ করেন, যা তাঁর একাডেমিক অবদান, গবেষণার মান এবং পেশাগত সম্ভাবনার স্পষ্ট স্বীকৃতি।
ড. সাবাহর গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর শিক্ষাগত রূপান্তর। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ফাইন্যান্সে আসা সহজ ছিল না। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, ফাইন্যান্সের মৌলিক ভাষা, ধারণা এবং পরিভাষা শুরুতে আয়ত্ত করা তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু এখানেই তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড হয়ে ওঠে বড় শক্তি। কারণ আধুনিক ফাইন্যান্স ক্রমেই গাণিতিক, বিশ্লেষণনির্ভর এবং কাঠামোগত যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে অর্জিত বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যাকে ভেঙে দেখার অভ্যাস, এবং কঠোর যুক্তির চর্চা তাঁকে ফাইন্যান্স গবেষণায় শক্ত ভিত গড়তে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে।
বর্তমানে তাঁর গবেষণা প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত—মার্কেট মাইক্রোস্ট্রাকচার এবং লেবার ফাইন্যান্স। মার্কেট মাইক্রোস্ট্রাকচার নিয়ে তাঁর গবেষণা মূলত শেয়ারবাজারে বাস্তবে কীভাবে লেনদেন সংঘটিত হয় এবং সেই প্রক্রিয়া কীভাবে দামের পরিবর্তন, লিকুইডিটি এবং বাজারের দক্ষতাকে প্রভাবিত করে তা বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে, লেবার ফাইন্যান্সে তিনি অনুসন্ধান করেন শ্রমবাজারের চাহিদা-জোগান, প্রযুক্তি গ্রহণ, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য শ্রমবাজার-সম্পর্কিত উপাদান কীভাবে কর্পোরেট নীতি ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
তাঁর চলমান গবেষণার একটি বিশেষ দিক হলো অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে শ্রমিকদের মজুরি ও পারিশ্রমিককে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা। এই প্রশ্নটি আজকের বিশ্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত শিল্প, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে, তাতে এই ধরনের গবেষণা শুধু একাডেমিক আলোচনায় নয়, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিকল্পনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ড. সাবাহর গবেষণাকর্ম ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেয়েছে। নতুন তথ্যের ভিত্তিতে শেয়ারের দামের উঠানামা, বিটকয়েন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট বাজার আচরণ, কোভিড-১৯ সময়ে শেয়ারবাজারের লেনদেন কার্যক্রমের পরিবর্তন, শ্রমবাজারের চাহিদা ও যোগানের সাদৃশ্য, এবং কর্পোরেট বিনিয়োগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে। তাঁর প্রকাশনা তালিকা যেমন বিস্তৃত, তেমনি তা প্রমাণ করে যে তিনি ফাইন্যান্সের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপক্ষেত্রে চিন্তাশীল ও ধারাবাহিক অবদান রেখে চলেছেন।
গবেষণার এই ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০২৬ সালে লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটির আর্লি ক্যারিয়ার এক্সিলেন্স ইন স্কলারশিপ পুরস্কার অর্জন করেন। এর আগে টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটি থেকেও তিনি পিএইচডির ছাত্র হিসাবে গবেষনায় এবং শিক্ষকতায় পুরষ্কার অর্জন করেন। এই অর্জনগুলো প্রমাণ করে, তাঁর সাফল্য হঠাৎ পাওয়া নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তোলা একাগ্রতা, শৃঙ্খলা ও মানসম্মত কাজের ফল।
শিক্ষক হিসেবেও ড. সাবাহর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লুইজিয়ানা টেকে তিনি স্নাতক, এমবিএ এবং ডক্টরাল পর্যায়ে বিভিন্ন কোর্স পড়ান। তাঁর কাছে শিক্ষকতা কেবল পাঠদান নয়; এটি জ্ঞানচর্চাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গভীর দায়িত্ব। গবেষণা ও শিক্ষাদানের এই যুগপৎ ভূমিকা তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যেসব শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে ফাইন্যান্স একাডেমিয়ায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের জন্য ড. সাবাহর বক্তব্য বাস্তবসম্মত এবং উৎসাহব্যঞ্জক। তাঁর মতে, ফাইন্যান্স একাডেমিয়া অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি পেশা। এখানে রয়েছে ভালো বেতন, বৌদ্ধিক স্বাধীনতা, কাজের নমনীয়তা এবং নিজস্ব গবেষণার ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ। অনেক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শাখার মতো এখানে গবেষণা পরিচালনার জন্য সবসময় বড় অনুদান সংগ্রহের চাপ থাকে না। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে ফাইন্যান্সে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি সাধারণত বিজনেস স্কুল থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয় এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই পুরো সময়ের জন্য ফান্ডিং নিশ্চিত থাকে, যা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় মনোযোগী হতে সহায়তা করে।
তবে তিনি এ কথাও স্পষ্টভাবে বলেন যে এই পথ সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ফাইন্যান্সে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া ক্রমেই আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। শক্তিশালী একাডেমিক প্রস্তুতি, উচ্চমানের জিআরই বা জিম্যাট স্কোর, এবং বিষয়ের প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতি—সবই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এই পথ সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় হলেও এটি তাদের জন্য, যারা দীর্ঘমেয়াদি পরিশ্রমে প্রস্তুত।
ড. নাসিম সাবাহর জীবনগাথার আসল শক্তি এখানেই—তিনি শুরু থেকেই নিজের শেষ গন্তব্য জানতেন না। তিনি পথ বদলেছেন, নতুন করে ভেবেছেন, নিজের আগ্রহকে চিনেছেন, এবং ধাপে ধাপে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। তাই তাঁর গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি নতুন প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—জীবনে পথ পরিবর্তন ব্যর্থতা নয়, বরং কখনও কখনও সেটিই মানুষকে তার প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
কুমিল্লা থেকে বার্সেলোনা, টেক্সাস থেকে লুইজিয়ানা—ড. নাসিম সাবাহর এই দীর্ঘ পথচলা আসলে আত্মআবিষ্কারের গল্প। তিনি দেখিয়েছেন, জীবনের শুরুতে লক্ষ্য নির্ধারিত না থাকলেও একাগ্রতা থাকলে যেকোনো বিষয় পরিবর্তন করেও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব। তাঁর এই সাফল্য কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মেধার এক উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন।






