একটি দৈনিক পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ডিএসসিসির ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মেয়র সাঈদ খোকন ও ফজলে নূর তাপসের আমলে ৮৮৩ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। তারা নেই কিন্তু আছে তাদের দোসররা। তারা এখন নতুন করে জড়িয়ে পড়ছে লুটপাটে।
ব্যারিস্টার তাপস মেয়র থাকাকালে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে শাহবাগের শিশুপার্ক উন্নয়ন প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির, একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রথমে এর ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয় ৭৮ কোটি টাকা। পরে এর ব্যয় বরাদ্দ সব সীমা পেরিয়ে এক লাফে এসে দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি টাকা।
এই প্রকল্পে ৪৪১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয় শিশু পার্কটির ১৫টি রাউড কেনা ও প্রতিস্থাপনের কাজে। শুধু তাই না, এসব রাইডের দরদামও দেখানো হয়েছে অবিশ্বাস্য অংকের। এদিকে, ডিএসসিসির আওতাধীন শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল এবং সারুলিয়া এলাকার সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের নজিরবিহীন লুটের ঘটনা ধরা পড়ে গেলে হৈচৈ পড়ে যায়। ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দের এই প্রকল্পের ১৫৪ কোটি টাকাই চলে যায় সংশ্লিষ্টদের পকেটে। এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে ২০২৪ সালের ২৫ মে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।
প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তাকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটি প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। জানা যায়, প্রকল্প পরিচালক বোরহানউদ্দিন এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মিথুন শীল প্রতিবেদনটি আলমারিতে তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের ৩৮ কোটি টাকার পুরোটাই লোপাট হয়ে গেছে।

এমন প্রমাণ সম্প্রতি পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক। দুদকের তদন্তে ওঠে এসেছে, এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর কথা ছিল। এর নিয়ন্ত্রণের ভার পড়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ওপর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সিগন্যাল বসানো তো দূরের কথা, ডিএসসিসিতে কোনো নিয়ন্ত্রণ কক্ষের অস্তিত্বই নেই। দুদক তদন্ত দল যেখানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপিত হওয়ার কথা, সেখানে আনসার সদস্যদের শয়নকক্ষ দেখতে পান।
এদিকে, হাজারীবাগ কসাইখানা নির্মাণের নামেও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ২ কোটি ৯৪ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যয় বরাদ্দের এই প্রকল্পে ইউরোপীয় যন্ত্রপাতির পরিবর্তে চায়নায় তৈরি যন্ত্রপাতি এনে অর্থ লোপাটের মহড়া সাজানো হয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সজিব করপোরেশনকে অর্ধেক মূল্যে পরিশোধ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের চূড়ান্ত পর্ব সারা হয়। ফলে কসাইখানাটি আজ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। একই ঘটনা ঘটেছে কাপ্তানবাজারের কসাইখানা নির্মাণের ক্ষেত্রেও। এখানেও ইউরোপীয় যন্ত্রপাতির পরিবর্তে চীনা যন্ত্রপাতি আনা হয় এবং স্থাপনের আগেই ২৫ কোটি ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬৫ টাকার অর্ধেক একই সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ সজীব করপোরেশনকে পরিশোধ দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। আজ পর্যন্ত কসাইখানাটি চালু করা সম্ভব হয়নি। মহাপরিকল্পনা তৈরির নামে সাতত্য নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও মহা তো দূরের কথা, আদৌ কোনো পরিকল্পনাই প্রণয়ন করা হয়নি। ফলে, পুরো টাকাটাই পকেটে চলে গেছে।
এমনি করে পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পের বর্জ্য অপসারণ কাজে বরাদ্দের ৫১ কোটি টাকা নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এরপরও লুটেরারা থেমে থাকেনি। আরও অতিরিক্ত ২২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা আত্মসাতের ছক সাজানো হয়েছিল। কিন্তু জানাজানি হয়ে গেলে সেই অর্থ আর ছাড় করা হয়নি। এতসব আত্মসাৎ নাটক যখন একের পর এক মঞ্চস্থ হচ্ছে, তখন মাতুয়াইল স্যানেটারি ল্যান্ডফিল্ড প্রকল্পের সীমানা প্রাচীরের কাজ না করেই ভৌতিক বিল তৈরি করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে নেয়।

পরে তদন্তে এটি প্রমাণিত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি লিখিতভাবে এই ভুয়া বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে নেয় এবং পরবর্তীতে কাজটি সম্পন্ন করে দেওয়ার মুচলেকা প্রদান করে। তবে প্রকল্প পরিচালক উত্তোলিত ওই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ঠিকাদারকে বারবার তাগাদা দিলেও আজও এ টাকা ডিএসসিসির তহবিলে জমা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সাবেক আওয়ামী সরকারের সময়ের লুটেরা চক্রটির দাপুটে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। মূলত সেই সময়ে গড়ে ওঠা শক্তিশালী লুটপাট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই এখন ডিএসসিসি। মেয়ররা বিদায় নিয়েছেন, প্রশাসক এসেছে কিন্তু সেই সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে।
সিন্ডিকেটের নেপথ্য নেতৃত্বে রয়েছেন, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম। ডিএসসিসিতে তার চাকরিই অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া এবং অনিয়মের মাধ্যমেই তার চাকরিকাল ২১ বছর অতিবাহিত হয়েছে। অভিযোগ আছে, আর্থিক উপঢৌকনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করে এই সিরাজুল ইসলাম বরাবরই চেয়ার রক্ষার পাশাপাশি সীমাহীন দুর্নীতিকে জায়েজ করেছেন। মহাপরিকল্পনা তৈরির নামে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের নামে ৩৮ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ ডিএসসিসির নানা অনিয়মের নেপথ্য নায়ক তিনি। লুটেরা চক্রের আরও যাদের নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন- তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী বোরহানউদ্দিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিসুর রহমান এবং অঞ্চল-৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মিথুন চন্দ্র শীল প্রমুখ।
সংস্থাটির যান্ত্রিক বিভাগের প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সাবেক মেয়র তাপসের আশকারাতে তার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগগুলো বরাবরই ফ্রিজ হয়ে থাকে। কাজী বোরহানউদ্দিন এবং মিথুন চন্দ্র শীলের বহু দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন।
সম্প্রতি ডিএসসিসির বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর নানা অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের তদন্তের জন্য সংস্থাটিকে একাধিকবার পত্র মারফত তাগাদা দেওয়া হলেও কোনো কাজই হয়নি। বরং উল্টো তাদের হাতেই অর্পিত হয়েছে বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্ব। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের আগেই দেশ ছাড়েন ব্যারিস্টার তাপস। এরপর থেকেই ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করেন অভিযুক্ত প্রকৌশলী ও অন্যরা।
এই বাস্তবতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ডিএসসিসি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে জয়ী ঘোষণা করেছেন আদালত। ২০২০ সালের ৩ মার্চ ডিএসসিসি নির্বাচন বাতিল চেয়ে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন ইশরাক। সেই মামলায় এই রায় দেন আদালত। কিন্তু দলীয় ও আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে ডিএনসিসিকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন কি-না তা দেখার জন্যে অপেক্ষা করত হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








