রাজাকার, আল বদর আর ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা মন্ত্রী হয়েছেন। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতায় সেই তাদের চরম বিরোধীতা ও বৈরিতার মুখে স্বাধীনতা পাওয়া এই দেশে মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন তারাই। যে লোকেরা ভিনদেশি পাকিস্তানীদের পথ চিনিয়ে কোন বাড়িতে মুক্তি আছে, কোন বাড়ির মেয়েরা বালেগ হয়েছেন কিংবা নাবালিকা হলেও সুন্দর তাদের বাড়ি চিনিয়েছেন ভিন্ন দেশিদের। পাকিস্তানী সেনাসদস্যদের যৌনসুখের যোগান দিতে এমন কিছু নাই করেন নি সেই রাজাকার আলবদরেরা মন্ত্রী হয়ে তাদের গাড়িতে পতপত করে উড়েছে রক্তের বন্যায় পাওয়া স্বাধীনতা তখন আজকের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধীরা কোথায় ছিলেন?
ধরেই নিলাম তারা বয়সে হয়ত নাবালেক ছিলেন কিন্তুু রাজাকারের গাড়িতে স্বাধীন দেশের পতাকা বইতে দেখে তাদের বাবা চাচা বা দাদাদের শরীরের পশমে কী টান পড়েছিল? হৃদযন্ত্রে খানিক ধাক্কা লেগেছিল ? না এসবের কিছুই হয়নি। যদি হতো তবে সেদিনের তরুণ যুবাদের স্মৃতিতে কিছু হলেও থাকতো। যে দেশে চিহ্নিত রাজাকার আল বদর আর তাদের উত্তরসূরিরা নানান পদ-পদবি, মন্ত্রীত্বের মর্যাদা পান। গাড়িতে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে ঘোরেন, নানান সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন তখন আজকের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা কোথায় থাকেন? যখনই মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান স্বজনদের জন্য নামে মাত্র কোটা বরাদ্দ হয় তখন আপনারা যারা ফাল দিয়ে উঠেন? তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে বড্ড ইচ্ছা হয়, আপনারা কারা, কাদের উত্তরসূরি?
সরকারের সংশ্লিষ্ঠ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা যদি তাদের পরিচয় শনাক্ত করেন অমুক মুক্তিযোদ্ধা নাতিনের ঘরের পুতিন কিংবা অমুক রাজাকারের নাতিনের ঘরের সতিনের ছেলে ইত্যাদি! আন্দোলনকারীদেও পরিচয় শনাক্ত করে তাদের মোটিভ উন্মোচন আজ জরুরি।
আপনারা কী এমন ঘটনা জানেন যে মুক্তিযোদ্ধার এক সন্তান লিখিত পরীক্ষায় পাশ করে উপরন্ত রের্কড পরিমাণ মার্কসও পায়। সেই সন্তানটিকে শুধুমাত্র ভাইভাতে গিয়ে সেই কোটার সুযোগ দেয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো নারী কোটা, জেলা কোটা, লিখিত পরীক্ষার রের্কড মার্কস থাকার পরও শুধু মাত্র মুক্তিযোদ্ধা কোটার আবেদন করেছে বলে সেই শিক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারীকে ভাইভা বোর্ডে অপেক্ষমান রুমে বসিয়ে রাখা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা?
সেই পরীক্ষার্থীর আকুতির মুখে ভাইভা বোর্ডে বিচারকদের সামনে নেওয়া হলেও সেই শিক্ষার্থীকে কোন প্রশ্নই জিজ্ঞেসা করা হয় নি বরং বলা হয়েছে, তোমার ভাইভার কী দরকার, মুক্তিযোদ্ধার সনদ ধুয়ে খাওগে। এসব বাস্তবতা এবং এমন অদ্ভুত সত্য ঘটনা এদেশেই ঘটেছে!

কষ্ট হয়, বড় কষ্ট এদেশের চোর-দুর্নীতিবাজরা চুরি করে পার পায়। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিলেও কোন সম্মানহানী হয় না। অথচ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদন করা শিক্ষার্থীকে ভাইভা বোর্ডে এই সমাজের দর্পন শিক্ষককূল তার সন্তানের বয়সী স্বপ্নবাজ সন্তানসম পরীক্ষার্থীকে মুক্তিযোদ্ধার কোটায় আবেদন করায় লজ্জা দেন। অপদস্ত করেন। একবারও ভাবেন না এই শিক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার কতবড় ঝক্কি লম্বা পথ পেরিয়ে ভাইভা বোর্ডে এসেছে তাকে ভাইভা বোর্ডের পবিত্র জায়গায় কত শিক্ষকেরা সম্মিলিতভাবে অপদস্থ করছে। এর ফলে একজন শিক্ষার্থী একজন সন্তানের মানসিকতা কোন পর্যায়ে যেতে পারে? সংবিধানের প্রতি সম্মান জানাতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েও ভাইভা বোর্ডের সম্মানিক শিক্ষক ও সদস্যরা?
আশ্চর্য বাস্তবে দেখেছি, ‘বাপে মানে না মায়ে গছে না’ এমন লোকও মামা শশুরের জোরে লবিং করে এনজিও’র অনুমোদন নেন। জোর তদবির করে লবিংয়ের জোরে পত্রিকার লাইসেন্স পান। দেশ-বিদেশ ঘোরেন। ভিন্ন দেশে মরুর বুকে কবিতা গাইয়ে যাবার তদবির করেন, তখন তাদের লজ্জা লাগে না। কিন্তু যখনই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রের সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় খরচে হজে নেওয়া হয় তখন সেই তারা নিজের কাজে না পরের কাজে লজ্জা পান। এ যেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। পারলে মুক্তিযোদ্ধার মূল্যবোধের পোস্টমর্টেম করেন। অথচ এই জ্ঞানী-গুণীজন, আপনারা যে সারাদিন লবিং করে তেলবাজি করে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতকিছু ছলেবলে কৌশলে আদায় করেন তখন সেই সব হিসেব রাখে কে?
শোনেন ভায়া মুক্তিযুদ্ধেও কোটা বিরোধীরা, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, সত্যিই যারা সম্মুখ সারির যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগ সাধারণ আম জনতা। কঠিন কটোর ,মূল্যবোধ ওয়ালা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক পাঁচসের হৃদয়ের হৃদয়বান। কারণ, যুদ্ধের ময়দানে খেয়ে না খেয়ে সাপ পোকা বেজি ইদিুর বাঁদুর আর বিশ্বের অন্যতম সেরা সেনাবাহিনীর সেই পাকিস্তানী সেনাদের বেয়োনেট ও গুলির মুখে নিজের বুক চিটিয়ে জীবন বাজি রেখেই কলিজাটা হাতে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন।
বাস্তবতায় সেই প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের সন্তান পরিবারের কতজনকে দেখেছেন? যুদ্ধের বছর যে ছেলেটি ছিল সবচেয়ে মেধাবী, ক্লাসে প্রথম সেই ছেলে যুদ্ধে গিয়ে হাত কিংবা পা হারিয়ে পঙ্গু হয়েছেন। একসময়ে মেধাবী তরুণ অসহায় জীবন যাপন করছেন। আর যারা যুদ্ধ থেকে জীবন নিয়ে ফেরেননি সেই পরিবারের স্বজন প্রিয়জন স্ত্রী পুত্র কন্যাদের কী অবস্থা গেছে সেই খবর আপনি আমি কী রেখেছিলাম।
তাদের সন্তানেরা মেধাবী হলেও পিতার বা পরিবারের অসহায়ত্বের কারণে উচ্চশিক্ষা, উন্নত জীবন মানের সন্ধান হারিয়ে ধুকেধুকে জীবন কাটিয়েছেন এমন কতজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছেন আপনারা? প্রকৃত বীরযোদ্ধা তাদের স্বজন, সন্তানেরা এই সমাজেই আছেন তবে পানির নিচের আইসের মত ডুবে আছেন! তাদের মাত্র এক ভাগ দেখা যায় বাকী তিন ভাগ পানির নিচে সেই আইসবার্গের ন্যায় লুকিয়ে।
এ সমাজের সম্মুখসারির আলোকিত অবস্থানে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেন নি আর দেখবেন না। কারণ সেই প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সন্তান স্বজনেরা ট্রেন ফেইলের মত যে একবার জীবনের ট্রেন সময়মতো পিতা বা স্বজনের অসহায়ত্বের কারণে পারেন নি। সেই ১৯৭১ সালে একবার জীবনের খেরো খাতার হিসেবে যেভাবে তারা ছিটকে গেছেন তাতে তারা সমাজের আলোর সারিতে পৌঁছাতে আর কোন দিনই পারবেন না। সেই যে পিছিয়ে পড়া লাইনচুত্য বীর ও তাদের স্বজনদের জীবনের লাইনে আনতে এখনো মুক্তিদোদ্ধার কোটা প্রয়োজন।
আরও কী জানেন, আমরা যারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান, বাবা চাচা ও তাদের স্বজনদের বাস্তবতায় দেখেছি, আজ মুক্তিযোদ্ধার নামে অর্থ ও বিত্তশালী যাদের দেখছেন, তাদের সবাই সমাজের সুবিধাভোগী। তাদের বেশিরভাগ যুদ্ধের ময়দান পালালেও স্বাধীনতার পর সুবিধা আদানে এগিয়ে ছিলেন। আমার বাবার সাথে তার বিত্তবান যে বন্ধুরা আবেগের বশে সহযাত্রী হয়ে যুদ্ধ করার মনোবৃত্তি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন, সংখ্যায় সমবয়সী ও একই এলাকার ১৫ থেকে ২০ জন। সেই বন্ধু গ্রুপের মাত্র ৭-৯ জন শেষ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে যুদ্ধ করেছেন। বাকীরা কদিন এদিক সেদিক ঘুরে, হোটেলে আরাম আয়েশে কাটিয়েছেন। যুদ্ধদিন গুজরান করেছেন। তাদের কেউ কেউ পালিয়েও গেছেন। কারণ যুদ্ধের ময়দানের অনিশ্চয়তা, কঠোর কঠিন পরিশ্রম, দিনের পর দিন ভালো মন্দ দূরের কথা, না খাওয়া পরিস্থিতি তারা মানাতে পারেন নি। যুদ্ধের ময়দানেও তারা ঘরের সেই আরাম আয়েশের জীবনের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি।

যুদ্ধ করার জন্য যে সাহস ও কঠিন আত্মত্যাগী মনোভাবের প্রয়োজন হয় বেশিরভাগের সেই সাহস ও মনোবৃত্তি ছিল না। ফলে ১৯৭১ সালের ভয়াবহ যুদ্ধদিনে প্রশিক্ষণের নামে পালিয়ে ভিন্ন দেশে কোন মতে ঘাপতি মেরে পার করেছেন। ১৯৭১‘’র ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সেই আগের সুযোগ আরাম আয়েশের জীবনে ফিরেছেন। লেখাপড়া শুরু করেছেন, চাকরি উচ্চশিক্ষা সবই শুরু করে নিজেকে নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছেন নতুন রুটিনে। আর সত্যিকারের অকুতোভয় বীররা যুদ্ধদিনের ভয়াবহতাকে জয় করে কী করেছেন জানেন, উচ্চশিক্ষায় রাশিয়া, আমেরিকা ইউরোপে পালিয়ে বা পাড়ি দেন নি। বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশকে গড়ে তুলতে নিজেকে আরেক দফায় নিয়োজিত করেছেন।
উচ্চশিক্ষার হাতছানি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের সব প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আবারও সচল হয় তাই ছোট বড় পদ পদবি ভাবেননি, যে যে পদে পেরেছেন যোগদান করে দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন। তবে যুদ্ধের দিনে ময়দান পালানো ভিরুরা ঠিকই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বসবাসযোগ্য স্বাধীন দেশে সুসময়ে ফিরেছন। দেশে নতুন নতুন পদবিতে পাভারি উঁচিয়ে উপভোগ করেছেন। চাকরিতে পদ-পদবির ভারিক্কি ওজন! এখনো কী বোঝা গেছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেই হাল ছাড়েন নি। বরং সংসারের ন্যায় জোড়াতালি দিয়ে ভাঙ্গাচোরা ফসলহীন দেশের মাটিতে ফল ফসল ফলানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। কল কারখানা অফিস আদালত পরিচালনা করে দেশকে সচল করতে ভূমিকা রেখেছেন। এর জন্য নিজের উচ্চশিক্ষার মোহ মুগ্ধতাকে আমলে নেননি। কথায় বলে সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশফোঁড়, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তাদের সময়ে আর দেশের অসময়ে নিজেদের আবেগ আনন্দ উন্নয়ন সবই জলাঞ্জলী দিয়েছেন। সেই ত্যাগের মূল্যায়ন রাষ্ট্র সমাজ করবে না?
যারা নিজের ভালোটা, আবেগ উন্নয়ন না দেখে দেশের জন্য নিজ স্বার্থ ত্যাগ করলো সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোন উদ্যোগ নিলে, কোন সুযোগ সুবিধা দিলেই আপনাদের কেন জ্বালানি হয়? আপনারা কারা, আপনারা কী পাকিস্তানের পরাজিত শক্তির উত্তরসূরি, জীবিত কিংবদন্তী?
ইতিহাস পড়ুন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমনকি আর যেসব দেশ রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছে সেই সব দেশে বীরদের হিরো গণ্য করে কীভাবে মর্যাদার পাশাপাশি সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় দেখুন জানুন খোঁজ নিন। পারলে পরিবারের মুক্তিযোদ্ধা বাবা, চাচা ও কাছের স্বজনদের কেউ থাকলে তাদের মুখে শুনুন যুদ্ধদিনের ভয়াবহ সব গল্প গাঁথা বাস্তব কঠিন ও দু:সহ সব সত্য। তবেই এই বীর মুক্তিযোদ্ধা-হিরোদের কদর বুঝতে পারবেন।
তবে আমার আপনার চারপাশে নানান সুযোগ সুবিধায় বেষ্টিত হয়ে থাকা ওইসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যারা ভীরু কাপুরুষ যারা আমার আপনার বাবা চাচাদের সাথে যুদ্ধে যেতে ঘর ছেড়েছিলেন বটে, কিন্তু যুদ্ধের ময়দান যে ভোগ-আরাম-আয়েসের জায়গা না বুঝে কঠিন দু:সহ সময়ে সেই যুদ্ধদিনে সামিল হতে গিয়েও ভোগের জীবনে ফিরে এসেছিলেন তাদের দেখে প্রকৃত বীরদের মূল্যায়ন করবেন না প্লিজ। যদিও সেই ভীরু যুদ্ধদিনে ময়দান পালানো সেই চেনা মুখগুলোই আজ মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চের প্রথম সারিতে। কারণ, যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে তারাই সময়মত লেখাপড়া শেষ করে খেয়ে পড়ে আরামে আয়েশে উন্নত জীবন গড়েছেন তাতে খুব দোষের কিছু না তবে ময়দান পালানো সেই ভীরুরাই মুক্তিযোদ্ধার বেশে প্রকৃত যোদ্ধাদের বীরত্বকে খাটো করে পুরো রাষ্ট্রে সমাজে ব্যক্তি বর্গে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযোদ্ধা নামের মাহাত্যে কালিমা লেপেছে।
তাই আপনাদের মত নতুন প্রজন্ম যারা নিজেদেও অস্তিত্বের খোঁজ জানে না স্বাধীনতার মানে বোঝে না। নিজ দেশে স্বাধীনতার সুখ কী বোঝে না তারাই বীরদের হেলা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সামান্য কোটা নিয়ে যুদ্ধে নামে। সেই ভীতু যুদ্ধের দামামায় ভয় পাওয়া সুবিধাভোগীরা আজ অর্থ বিত্তশালী। উপরন্ত সেই ভিরু যুদ্ধের ময়দান পালানো মানুষগুলোই আজ মুক্তিযুদ্ধের ধার করা স্মৃতিকথায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সরিয়ে অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা, পদ, পদবির জোরে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিচ্ছে। ভোগ করছে নানান সুযোগ, মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা মঞ্চে। তারাই বয়ান করছে মুখস্ত করা যুদ্ধদিনের কিছু স্মৃতি। আপনারা তাদের উত্তরসূরি হয়ে কোটা বিরোধী আন্দোলন করবেন এটাই স্বাভাবিক। ভীরু যুদ্ধের ময়দান পালানো কাপুরুষদের মতই আপনারা নিজের মেধা ও মননের শক্তিতে বলিয়ান নয়। আরে ভাই লিখিত পরীক্ষায় পাস করে তবেই ভাইভাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধার কোটায় খানিক সুবিধা পাবেন। সেই পর্যন্ত মেধার জোরে সবাই সমান।
বাবা, চাচা বা আর কোন স্বজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে গিয়ে থাকলে তাদের কাছে যুদ্ধ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানুন। তাদের মুখে কিছু গল্প অনন্ত শোনার সৌভাগ্য হলে আপনাদের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন অ্যালার্জি থাকবে না। তবে এটা শতভাগ ঠিক যে, যুদ্ধ দিনের ভয়াবহ ঘটনা আর যে অদম্য সাহসে যে মানুষগুলো ১৯৭১’এ অস্ত্র ধরেছিলেন তারা দেশ স্বাধীন হবে, স্বাধীন বাংলাদেশ পাবেন এর বাইরে আর কিছুই আশা করেন নি। কোটাফোটা তো বহুত দূরের কথা। ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে কোন প্রলোভনই তাদের সামনে ছিল না। শুধুই ছিল স্বাধীন দেশে নিজের মত বাঁচার প্রবল আশা ও ভরসা।
কী দুর্ভাগ্য আমাদের এদেশের তরুণ সমাজের। যে দেশে উচ্চবিত্তের উচ্চপদধারীরা উত্তরা গুলশান, বনানীতে, রিমঝিম, পূর্বাচল বা পশ্চিমাচল নামে, সেনামে প্লট, ফ্ল্যাট আর কোটি টাকার শুল্কমুক্ত গাড়ি পেতে পারেন তাতে দোষ নেই। তখন প্রতিবাদ করার কেউ থাকে না, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু করলেই গাঁ জ্বলে যাদের আপনারা কারা। তাদের চিহ্নিত করার আবেদন করছি। আজ রাজনৈতিক বিকিকিনিতে ব্যবহার হয় দেশ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুটি। দুর্বৃত্তায়নের উদ্দেশ্যে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা প্রকৃত যোদ্ধোদের আবেগ-অনূভুতি কেন বুঝবে? তবে সময় যেভাবে এগোচ্ছে আপনাদের না হোক আপনার সন্তান নাতিপুদের হয়ত নিজের দেশে পরাধীনতা কী তার মুখোমুখি হতেই হবে। সেদিন বুঝবেন দেশের স্বাধীনতা কী এক অমূল্য রতন? কেন এই মনি মানিক্য সম স্বাধীনতার জন্য আম জনতা সাধারণ মানুষ প্রাণ দিতে পিছপা হন নি?
তবে সেদিন আর দূরে নয়। সহসায় হয়ত নিজ দেশে পরবাসী হয়ে চাকরি, টিকে থাকার প্রয়োজনে স্বাধীনতার মাহাত্য রক্ষায় আবারও লড়ার প্রয়োজন হবে। কিন্তু এই আপনারাই যেভাবে আপনার স্বজন-সন্তানেরা এক পা এগুলেও দশ পা পিছিয়ে যাবেন। আত্মকেন্দ্রীক আপনাদের বেশিরভাগই উন্নত জীবন মানের আশায় প্রত্যাশায় ইউরোপ, আমেরিকা কানাডা, মালেয়েশিয়াতে পাঠিয়ে রাখছেন। আপনার স্বজন সন্তান তখন দেখবেন কাবুলিওয়ালাই দেশ চালাচ্ছেন। সেদিন হয়ত ১৯৭১’র সম্মুখ সমরের সাহসী যোদ্ধাদের আবারও প্রয়োজন হবে।
তবে কী জানেন সেই প্রকৃত বীর আর তাদের মত সেই আবেগ ও দু:সহকে জয় করার সাহসী সন্তান এদেশের মাটিতে আর কেউই থাকবে না। সবাই লুটেরা, সুবিধাভোগী নিজ স্বার্থে প্রয়োজনে খাল কেটে কুমি আনার দলে, এর পরিণতি যে কী ভয়াবহ হবে যা আগাম উপলব্ধি করার মত অন্তরচক্ষু মন ও মেধা সর্বপরি সামান্য সর্ষে দানা পরিমাণ দেশ প্রেম আপনাদের নেই। সুতারং আপনারা স্ববিরোধী, দেশবিরোধী, স্বাধীনতার বীরদের পচিয়ে গলিয়ে কাবুলিওয়ালাদের পথ সুগম করুন। আপনারা আন্দোলন লড়াইতে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম শব্দগুলোকে শবগারে পাঠান। এদেশের দূরদিনে দেশপ্রেম কিংবা ১৯৭১’র সম্মুখসারির সেই সাহসী আবেগ আর কোনদিনই আর লড়বে না।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








