বৈশ্বিক তামাক কোম্পানি ফিলিপ মরিসকে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সরকারের এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো।
নিকোটিন পাউচ দেখতে ছোট টি-ব্যাগের মতো। যার ভেতরে রাসায়নিক মিশ্রিত নিকোটিন, সুগন্ধি ও অন্যান্য উপাদান থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি তামাকজাত পণ্যের বিকল্প আকারে নতুন এক আসক্তিকর বিপণন কৌশল, যা তরুণদের মধ্যে নিকোটিন নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডকে একটি সম্পূর্ণ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে প্রাথমিকভাবে ৫৮ দশমিক দুই লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৫ হাজার ৩৬৩ লাখ ইউনিট নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে বলে জানানো হয়েছে।
বেজা বলছে, বাংলাদেশে এই ধরনের পণ্য উৎপাদন বা রপ্তানির ওপর কোনো সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই এবং কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কর্তৃক অনুমোদিত ‘অ্যান্টি-নিকোটিন প্রোডাক্ট’ হিসেবে আবেদন করেছে।
তবে সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-সিগারেট ও ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করার কয়েক মাস পরই বেজা এই অনুমোদন দেয়।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যান্টি-টোব্যাকো অ্যালায়েন্স। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে,
নিকোটিন পাউচ মূলত তরুণদের মধ্যে নতুন করে আসক্তি তৈরির এক বাণিজ্যিক কৌশল। ধূমপান ত্যাগে সহায়তা করে এমন বিভ্রান্তিকর দাবি তুলে তামাক কোম্পানিগুলো আসলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আড়াল করছে।
সংগঠনটির মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার অঙ্গীকারের সঙ্গে এই অনুমোদন সাংঘর্ষিক।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্সের সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অরূপ রতন চৌধুরী বলেছেন, নিকোটিন পাউচ আসক্তি তৈরি করে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যারা আগে কখনো ধূমপান করেনি। ক্ষতিকর নয় মনে করে ব্যবহার শুরু করলে পরবর্তীতে তারা নিকোটিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে বলতে পারি, এই ধরনের পণ্য মুখের নানা রোগের কারণ মাড়ির প্রদাহ ও আলসার থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি।
জাতীয় যুব পরিষদের চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ সাকিব মন্তব্য করেছেন, তরুণদের লক্ষ্য করে তৈরি এই পণ্যের অনুমোদন জাতীয় স্বাস্থ্য লক্ষ্য ও লাখো তরুণের জন্য বিপজ্জনক বার্তা।
২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ক্ষতিকর তামাকজাত পণ্যের প্রচার ও সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
পাবলিক হেলথ ল’ ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিকোটিন পাউচকে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এমন পণ্যের অনুমোদন দিয়ে বেজা আদালতের নির্দেশনা ও সংবিধান উভয়ই লঙ্ঘন করেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় গত মে মাসে বিডা ও বেপজা-কে অনুরূপ প্রকল্পে অনুমোদন না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু বেজা, যা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত, সেটি ফিলিপ মরিসকে অনুমোদন দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ নিকোটিন পাউচকে তামাকজাত পণ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এগুলো প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের জন্য সিগারেটের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর হতে পারে, তবে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সিডিসি (CDC) উভয়েই সতর্ক করেছে, নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তিকর পদার্থ এবং তরুণ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের কারণে চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসে ক্ষতি হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যেখানে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল মাত্র ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাক-সম্পর্কিত রোগে বাংলাদেশে মারা যান ।
বেজা ২৮ অক্টোবর এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ মেঘনা ইকোনমিক জোনে কারখানা স্থাপনের সব শর্ত পূরণ করেছে। বাংলাদেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদন বা রপ্তানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই এবং পণ্যটিকে আমরা এফডিএ অনুমোদিত ‘অ্যান্টি-নিকোটিন প্রোডাক্ট’ হিসেবে বিবেচনা করছি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ফিলিপ মরিসকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, যা বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তর পর্যালোচনা করছে।
দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ফিলিপ মরিস বাংলাদেশকে মন্তব্যের জন্য ২৫ অক্টোবর ইমেইল পাঠানো হলেও ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো উত্তর মেলেনি। বারবার ফোন করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, এই অনুমোদন বাংলাদেশের তামাকমুক্ত লক্ষ্য ও জনস্বাস্থ্যের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে বেজা যুক্তি দিচ্ছে, এটি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট, নিকোটিন পাউচ নতুন প্রজন্মের জন্য এক নীরব আসক্তির দরজা খুলে দিতে পারে।








